ঋষভনাথ > ঋ-ষভ-নাথ > ঋ-শিব-নাথ > শিব।
অর্থাৎ যিনি ঋষভনাথ তিনিই শিব।
ঋষভনাথ জৈন ধর্মের প্রবর্তক। আর শিব হলেন হিন্দুদের দেবাদিদেব মহাদেব। শিব হিন্দুদের প্রধান উপাস্য। অর্থাৎ জৈন ধর্মের প্রবর্তক ঋষভনাথই হিন্দুদের উপাস্য শিব। এতে চমকিত হওয়ার কিছু নেই। এটাই সত্য। এটাই সনাতন। ঋষভনাথই প্রথম ভারতীয়দের মধ্যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। সেটাই ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম। সেটাই সনাতন ধর্ম। অর্থাৎ ঋষভনাথ প্রবর্তিত ভারতের সর্বপ্রাচীন ধর্মটিই সনাতন ধর্ম(অহিংসার ধর্ম)। এই ধর্মই জৈনদের কাছে জৈন ধর্ম, আর হিন্দুদের কাছে হিন্দু ধর্ম। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ভারতের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই সনাতন ধর্মই জৈন ধর্মের রূপ নিয়েছে, আবার হিন্দু ধর্মের রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ শিকড় একটাই । শাখা-প্রশাখা বিভিন্ন।
জৈন ধর্মও সনাতন ধর্ম, আবার হিন্দু ধর্মও সনাতন ধর্ম। তাহলে জৈন ধর্ম এবং হিন্দু ধর্ম কি এক ? বলা যেতে পারে। কেবল রুপভেদেই আলাদা। জৈন ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যে ফারাক শুধু এটুকুই যে, জৈন ধর্ম ঋষভনাথকে প্রথম তীর্থঙ্কর হিসেবে মানে এবং ঋষভনাথ পরবর্তী আরও ২৩ জন তীর্থঙ্করকে তারা অনুসরণ করে। কিন্তু হিন্দু ধর্ম কেবলমাত্র ঋষভনাথকে শিব হিসেবে অনুসরণ করে অর্থাৎ হিন্দুরা ঋষভনাথের অনুসারী। হিন্দুদের কাছে ঋষভনাথ শিবে রূপান্তরিত আর জৈনরা ঋষভনাথ সহ ২৪ জন তীর্থঙ্করের অনুসারী। জৈন ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যে এটাই শুধু ফারাক। তবে দুঃখের বিষয় পরবর্তীকালে আরো কিছু ফারাক তৈরি হয়েছে, বলা যায় তৈরি করা হয়েছে, ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্তে। নানান কৃত্রিম দেব দেবী তৈরি করে, শত শত লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি দেবদেবী তৈরি করে হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক, হিন্দুদের আসল উপাস্য এই শিবকে একেবারে আড়াল করে দেওয়া হয়েছে। সে বিষয় নিয়েই এই আলোচনা।
ছত্রিশ কোটি দেবদেবী নিয়ে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, সেটা পন্ডশ্রম হবে। আমার এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো এটাই যে এত দেব-দেবীর কাহিনী কেন তৈরি হল, তার পিছনের উদ্দেশ্য কি। তবে আমি এখানে বিশেষ করে দুর্গা ও কালী এই দুই দেবী, যারা কিনা প্রতিবছর বাঙালির দ্বারা পূজিত হন খুব জাঁকজমক সহকারে, তাদের উপর আলোকপাত করেই আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তাহলেই আশা করি বিষয়টা পরিষ্কার হবে।
ভারতের যারা আদি অধিবাসী তাদের মধ্যে অসুর হলো একটি সম্প্রদায়, যারা একসময় যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল এবং ভারতবর্ষব্যাপী তাদের ভাল রকমের রাজনৈতিক আধিপত্য ছিল, শাসন ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল এবং তাদের উপাস্য ছিলেন শিব। তারা ছিলেন শিবের উপাসক, অর্থাৎ এদেশের আদি সনাতন ধর্মের অনুসারী।
অসুর রাক্ষস দানব দস্যু ইত্যাদি বিভিন্ন নামে ভারতের পৌরাণিক আখ্যানগুলোতে যে জনগোষ্ঠী গুলির কথা জানা যায় তারা মূলত ভারতেরই সুপ্রাচীন আদি অধিবাসী। রামায়ণ মহাভারতেও এদের কথা বলা আছে। সেখানে দেখতে পাচ্ছি রাম লক্ষণ অসুর বা রাক্ষস বধ করছে বা ভীম অর্জুন এরা অসুর বা রাক্ষস বধ করছে। রামায়ণের রাম লক্ষণ বা মহাভারতের ভীম অর্জুন এরা এইজন্যই অসুর বা রাক্ষস বধ করছে যে, এই অসুর বা রাক্ষসেরা এসে তাদের যজ্ঞ নষ্ট করছে। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে ভুংভাং মন্ত্র সহযোগে যজ্ঞের মাধ্যমে এই যে উপাসনা পদ্ধতি যাকে বৈদিক ধর্মমতে যজ্ঞ বলা হয় সেই বৈদিক ধর্মীয় যজ্ঞ বা এ ধরনের উপাসনা পদ্ধতিতে তারা বিশ্বাসী ছিল না, সেটা বোঝা যায়। তাদের দেশে এই ধরনের উদ্ভট নবাগত ভিন জাতীয় ধর্মীয় উপাসনা তারা মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি বা মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা সেগুলি ভন্ডুল করার চেষ্টা করতো। এ থেকে এটা একদম স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই বৈদিক ধর্ম বা এই যজ্ঞ উপাসনা এগুলো এদেশের মানুষের ধর্ম বা ধর্মীয় উপাসনা পদ্ধতি ছিল না এবং এদেশের মানুষ ভিন্ন ভাবে ধর্ম পালন করতো বা এদেশের মানুষের ধর্ম ছিল এদের থেকে ভিন্ন অন্য কিছু। সেই ধর্ম কি ? আমরা সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে তার কিছু আভাস পাই। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি সিন্ধু সভ্যতার মানুষ সূর্যের উপাসনা (অধুনা ছট পূজা, এখনো টিকে আছে ভারতের বিশেষ কিছু অঞ্চলে) করতো, পশুপতিনাথ (ধারণা করা যায় প্রকৃতপক্ষে পশুপতিনাথের এই মূর্তি প্রকৃতপক্ষে জৈন ধর্ম প্রবর্তক ঋষভনাথের মূর্তি, হিন্দুদের কাছে যিনি শিব হিসেবেই উপাস্য) ছিলেন হয়তো তাদের আর এক উপাস্য। এই পশুপতিনাথ যোগাসনে উপবিষ্ট একজন যোগী। ঋকবেদে আমরা দেখতে পাই, ইন্দ্র নগর আক্রমণ করে ধ্বংস করছে এবং সেই নগরের যোগীদের হত্যা করছে। ঋকবেদের এই সাক্ষ্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং অর্থবহ। অর্থাৎ ইন্দ্রের ধর্ম আর এই যোগীদের ধর্ম যে ভিন্ন ছিল এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতিভূ হওয়ার কারণে ইন্দ্র যে যোগীদের হত্যা করছে সেটা ধারণা করা যায়। লক্ষ্য করুন, জৈনদের তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ থেকে মহাবীর সবাই যোগী। হিন্দুদের উপাস্য শিব তিনিও যোগাসনে উপবিষ্ট যোগী। ঋষভ অর্থাৎ বৃষ তার বাহন, তিনি বৃষ অর্থাৎ ঋষভের অধিপতি ঋষভনাথ। অর্থাৎ এটুকু আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে বৈদিক ধর্ম অর্থাৎ ইন্দ্রের ধর্ম, আর এদেশের প্রাচীন অধিবাসীদের ধর্ম ছিল পরস্পর সাংঘর্ষিক। তাই বৈদিক আর্যরা বা বৈদিক ধর্মানুসারিরা যখন এ দেশে প্রবেশ করলো তখন তারা এদেশের ধর্মকে ধ্বংস করতে চাইলো। কারণ এদেশের ধর্ম ছিল তাদের ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা ধ্বংস করতে চাইলো এদেশের মানুষের ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা, তারা ধ্বংস করতে চাইলো এদেশে প্রচলিত ধর্মের উপাস্যকে, তারা ধ্বংস করতে চাইলো এদেশের প্রচলিত ধর্মের অনুসারীদের। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায়, তারা এ দেশে প্রচলিত ধর্ম, ধর্মীয় সংস্কৃতি, ধর্মের প্রবর্তক বা ধর্মীয় দর্শন এ সব কিছুকেই মুছে ফেলতে চাইলো ইতিহাসের পাতা থেকে। অর্থাৎ এদেশের প্রাচীন সভ্যতার চিহ্নকে তারা একেবারে মাটি চাপা দিতে চাইলো। তার জন্য তারা নানা কৌশল রচনা করলো, নানা কাহিনী, নানা আখ্যান তৈরি করলো, নানা গল্পকথা তৈরি করলো, যার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল এদেশের মানুষের আসল সভ্যতা, আসল সংস্কৃতি, আসল ইতিহাস, আসল ধর্ম, আসল দর্শন। সেইসব কৌশলের মধ্যে দুটি হল দুর্গাপূজা ও কালী পূজার প্রবর্তন।
দুর্গাপূজা মানে অসুর নিধন, অসুর মানে এদেশের আদি অধিবাসী যারা শিবের উপাসনা করতো, ঋষভনাথের উপাসনা করতো, যারা সনাতন ধর্মের অনুসারী ছিল, এ দেশের প্রাচীন ধর্মের ধারক ও বাহক ছিল, তাদেরকে হত্যা করার উৎসব চালু করলো। এটাই হলো দুর্গাপূজার আসল উদ্দেশ্য। এদেশের মাটি থেকে অসুর সভ্যতাকে মুছে ফেলে দেওয়া অসুর নিধনের মধ্য দিয়ে, অসুরকে খলনায়কের আসনে বসিয়ে এমন এক সংস্কৃতি চালু করা যা এদেশের মানুষের চিন্তন এবং মননে অসুর বিরোধী মানসিকতা গড়ে তুলবে। এটাই ছিল এই উৎসবের মূল লক্ষ্য।
দুর্গাপূজা হচ্ছে অসুর নিধনের উৎসব, আর কালী পূজা হচ্ছে অসুরেরা যার উপাসনা করে তাকে মানুষের মন থেকে নির্মূল করণের উৎসব। কালী পূজায় আপনারা দেখবেন কালীর পায়ের নিচে শুয়ে আছে শিব। অর্থাৎ কালীকে তৈরি করা হলো এদেশের মানুষের পরম আরাধ্য, পরম উপাস্য শিবকে পদানত করার জন্য। কিন্তু এদেশের মানুষ সেটা মেনে নেয়নি বা গ্রহণ করেনি। তাই এদেশের মানুষের কাছে সেটাকে গ্রহণীয় করে তোলার জন্য তারা সেই ভাবেই কাহিনী নির্মাণ করলো। তারা গল্প তৈরি করলো যে শিব আসলে কালীর স্বামী,তাই স্বামীর গায়ে পা পড়ে যাওয়ায় লজ্জিত ও কুন্ঠিত হয়ে কালী জিভ বের করলো। এইরকম একটি গল্প তৈরি করতে তারা বাধ্য হলো শিবকে কালীর পায়ের তলায় রেখে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আদপে এটা ছিল কালীকে দিয়ে এদেশের মানুষের উপাস্যকে পদানত করার প্রতীকী উৎসব। অর্থাৎ শিবকে মুছে ফেলার জন্য তারা তৈরি করলো কালী নামক দেবীকে। এইভাবে এদেশের মানুষের উপাস্য শিব আড়ালে চলে গেলেন এবং কালী হয়ে উঠলো উপাস্য দেবী। শিবকে তারা পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারলো না, কিন্তু নগণ্য করে দিতে পারলো, গৌণ করে দিতে পারলো, গুরুত্বহীন করে দিতে পারলো এবং সবচেয়ে বড় কথা আড়ালে ঠেলে দিতে পারলো। আর এই কাজটুকু করার মধ্য দিয়েই এদেশের আসল ধর্ম এবং আসল উপাস্য এবং এদেশের মানুষের যে ধর্ম আর তার যে প্রবর্তক তারা ইতিহাসের অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল। ভাবতে পারেন কত বড় ক্রূর ষড়যন্ত্র, কত বড় ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা, আর তা রূপায়ণের জন্য তারা তৈরি করলো কত সুনিপুণ চিত্রনাট্য। ভাবতে অবাক লাগে, যে শিব ছিলেন নগর সভ্যতার প্রতিভূ(সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত পশুপতিনাথের মূর্তি), তাকে এই বৈদিক চক্রান্তকারীরা পাঠিয়ে দিলো শ্মশানে, গায়ে মাখিয়ে দিলো ছাই, হাতে ধরিয়ে দিলো গাঁজার কল্কে তাদের রচিত মিথ্যা গালগল্পে ভরা আখ্যান, উপাখ্যান ও পৌরাণিক কাহিনীর মাধ্যমে।
শেষে উপসংহারে আর একটুখানি বলি, যেটা না বললেই নয়, যেটা না বললে বুঝতে অসুবিধা হবে, আর যেটা জানলে বুঝতে সুবিধা হবে পুরো পরিকল্পনা ও চিত্রনাট্য। সেটা হল, এই দুর্গা পূজা বা কালীপূজাকে এদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য যে সুনিপুণ কৌশল অবলম্বন করেছিল সেটা হচ্ছে এই দুর্গা এবং কালী দুজনকেই তারা শিবের পত্নী হিসেবে দেখিয়েছে। শিবের সঙ্গে এই যে সম্পর্ক তৈরি করা এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার কারণ এদেশের মানুষের মনে ছিল শিব, এদেশের মানুষ ছিল শিবের উপাসক। তাই শিবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এদের গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। শিবের সঙ্গে এই সম্পর্ক তৈরি না করলে এরা হয়তো এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বা মান্যতা পেত না। অর্থাৎ শিবকে মারার জন্য খুব সুচতুরভাবে শিবকেই এরা ব্যবহার করলো। এতটাই ধুরন্ধর এরা। এদের এই সুগভীর ষড়যন্ত্রই এদেশের মাটি থেকে আমাদের ইতিহাস মুছে দিয়েছে আর আমাদের ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপের উপর ওরা ওদের বৈদিক বর্ণবাদী ভেদবাদী ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতির ইমারত নির্মাণ করেছে। তাই শিবের পুজো, নীল পূজো, গাজন, চড়ক এসব একসময়ের জনপ্রিয় উৎসব এখন গৌণ হয়ে গেছে, আড়ালে চলে গেছে। আর ব্রাহ্মণ পুরোহিতের পৌরোহিত্যে সম্পাদিত দূর্গা পূজা, কালীপূজাকে জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলা হয়েছে, প্রধান উৎসবে পরিণত করা হয়েছে পুরোহিত তন্ত্র ব্রাহ্মণ্যবাদ বৈদিক মন্ত্র বৈদিক ধর্ম এসবকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের
ব্যবসা বিস্তারের জন্য। লক্ষ্যণীয় যে, ছটপুজো বা শিবের পুজোতে কিন্তু ব্রাহ্মণ পুরোহিতের মাতব্বরির জায়গা নেই। তাই সেগুলোকে নগণ্য ও তুচ্ছ করে দিয়ে দুর্গাপূজা ও কালীপূজাকে ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রচারের মধ্য দিয়ে বাঙালির মূল সংস্কৃতি ও মূল উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। আর আমরা সেটা না বুঝেই সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন