সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সনাতন ধর্ম ও শিব

 হিন্দু ধর্মটা আসলে কি ? এটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। কেউ বলছে বৈদিক ধর্মই হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে মূর্তি পূজা হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে হিন্দু ধর্ম কোন ধর্মই নয়।

আসুন এই প্রশ্নের মীমাংসা করা যাক।

প্রথমে আসি বৈদিক ধর্মের প্রসঙ্গে। বেদকে কেন্দ্র করে যে ধর্ম পল্লবিত হয়েছে সেটাকেই অনেকে হিন্দু ধর্ম বলে মনে করেন, বেদকেই হিন্দু ধর্মের ভিত্তি বলে মনে করেন এবং বৈদিক দর্শনকেই হিন্দু ধর্মের দর্শনের ভিত বলে মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, বেদে হিন্দু শব্দের কোন উল্লেখ নেই। বেদের মধ্যে কোথাও মূর্তিপূজা করার কথা বলা নেই। শিব কালি দুর্গা এদের কথা নেই। বেদের মুখ্য দেবতা হলেন ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র এরা। আর বেদের কোথাও এদের মূর্তি করে পূজা করার কথা বলে নেই। বেদে যে ধর্ম উপাসনার কথা বলা হয়েছে তা হলো যাগযজ্ঞ, যজ্ঞের মাধ্যমে উপাসনা। তাহলে হিন্দুরা যে মূর্তি পূজা করে এটা তো বৈদিক ধর্ম সম্মত কোন ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্মে মূর্তিপূজাই প্রধান। হিন্দু ধর্মের সেই মূর্তি পূজায় ইন্দ্রের কোন জায়গা নেই।আবার হিন্দুরা যেসব দেবদেবীর পূজা করে সেই দেবদেবীর কথা বেদে উল্লেখ নেই। বেদে যেসব দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে, ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র, হিন্দুরা সেসব দেবতার পূজা বা উপাসনা করে না। তাহলে বেদ হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ হয় কি করে ? তাই বেদে  উল্লেখিত ধর্ম হিন্দু ধর্ম হয় কি করে ? ঠিকই ধরেছেন, বেদ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ নয়, বেদের দেবতা হিন্দুদের দেবতা নয়। বেদ যে ধর্মকে ব্যাখ্যা করে তা হিন্দু ধর্ম নয়, তা হল বৈদিক ধর্ম। ইন্দ্র বরুণ এরা হলো বৈদিক দেবতা। আর হিন্দুরা যে ধর্মটা পালন করে তার সঙ্গে বৈদিক ধর্মের অর্থাৎ বেদে উল্লেখিত ধর্মের কোন মিল নেই বা কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম আলাদা ধর্ম, আর হিন্দু ধর্ম আলাদা ধর্ম। তার আরো একটা জলজ্যান্ত প্রমান হলো শিব, আসমুদ্রহিমাচল, হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ শিবের উপাসনা করে। অথচ বৈদিক ধর্মের গ্রন্থ বেদে সেই শিবের কোন উল্লেখ নেই। কেন ? কারণ শিব হিন্দুদের দেবতা বা উপাস্য, আর বৈদিক ধর্মটা হিন্দু ধর্ম নয়, আলাদা স্বতন্ত্র একটি ধর্ম। তাই বেদে শিবের কথা উল্লেখ থাকার কথা নয়, আর এটাই প্রমাণ করে হিন্দুদের মনের মণিকোঠায় বাস করা, হিন্দুদের হৃদয়ে আসন পেতে উপবিষ্ট দেবতা শিবকে কেন্দ্র করে যে ধর্ম সেটাই হলো হিন্দু ধর্ম। শিবই হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক এবং প্রধান উপাস্য। শুধু তাই নয়, এই শিব হলেন একজন যোগী, সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত সিলমোহরে এই যোগী মূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা পশুপতিনাথ বলেই পরিচিত। নেপালে পশুপতিনাথের মন্দির রয়েছে ।অর্থাৎ ওই পশুপতিনাথই শিব, আর শিবই পশুপতিনাথ।

হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, এই শিব হলেন যোগী। আর ঋকবেদে ইন্দ্রের দ্বারা যোগীদের হত্যা করার কথা বলা হয়েছে। কারণ এই যোগীরা যে ধর্মটি পালন করতেন তা বৈদিক ধর্ম অর্থাৎ ইন্দ্রের ধর্মের থেকে ছিল ভিন্ন। তাই ভিন্ন ধর্ম হওয়ার কারণে ইন্দ্র যোগীদের হত্যা করেছে। এ কথা ঋগ্বেদে লিখিত আছে।

জৈন ধর্মের প্রবর্তক ঋষভনাথ। ঋ-ষভ-নাথ > ঋ-শিব-নাথ > শিব। শিবের বাহন ষাঁড়, অর্থাৎ ঋষভ, অর্থাৎ শিবই ঋষভনাথ। অর্থাৎ জৈন ধর্মের প্রবর্তক তথা প্রথম তীর্থঙ্কর এই ঋষভনাথই হিন্দুদের কাছে শিব  হিসেবে পূজিত হন। অর্থাৎ হিন্দু ধর্মটা হলো আসলে জৈন ধর্মেরই আর এক রূপ। যিনি জৈন ধর্মের প্রবর্তক তিনিই হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক শিব। 

নব্য প্রস্তর যুগের মানুষ যখন কৃষিকাজ করতে শিখলো তার আগে পশু শিকার ছিল মানুষের খাদ্য সংগ্রহের একটি অন্যতম প্রধান উপায়। পশু শিকার অর্থাৎ পশু হত্যা। মানুষ কৃষিকাজ করতে শেখার পর ভারতীয় উপমহাদেশে আবির্ভূত হলেন ঋষভনাথ। তিনি বললেন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখন খাদ্যশস্য প্রস্তুত, তাই অহেতুক পশু শিকার করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তোমরা পশু হত্যা বন্ধ কর, হিংসা ত্যাগ কর এবং অহিংসার পথে চলো। এটাই ছিল ঋষভনাথের শিক্ষা। মানবজাতিকে তিনিই প্রথম অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। তারই পথ ধরে আরও ২৩ জন তীর্থঙ্কর এই অহিংসার বাণী প্রচার করে যান, জৈন ধর্মে যারা একত্রে ২৪ তীর্থঙ্কর নামে পরিচিত। আবার ঋষভনাথের যে অনুসারীরা তাকেই পূজার আসনে বসালেন, তাদের হৃদয় মন্দিরে তাকে জায়গা দিলেন, এই অনুগামীদের দ্বারা জন্ম নিলো হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্ম বা আদি সনাতন ধর্ম। তাই হিন্দু ধর্ম জৈন ধর্ম এই দু'ধর্মের প্রবর্তকই একজন, তিনি হলেন ঋষভনাথ। তাই প্রকৃত সনাতন ধর্ম বলতে হলে জৈন ধর্মকে এবং সেই সঙ্গে হিন্দু ধর্মের আদি রূপকেই বোঝাতে হবে। পরবর্তীকালে হিন্দু ধর্মের মধ্যে অনেক ভেজাল ঢুকে এই ধর্মের আসল রূপটিকে বদল করে দিয়েছে বা আড়াল করে দিয়েছে। এটা হিন্দু ধর্মের পক্ষে ক্ষতিকর হয়েছে। এর ফলে হিন্দু ধর্ম তার আসল চেহারা হারিয়ে ফেলেছে। এখন আমাদের হিন্দু ধর্মের সেই আসল রূপটাকে খুঁজে বের করে আনতে হবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরিচাঁদ ও তাঁর সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম

•    মতুয়া ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল পূর্ব বাংলার এক অতি প্রত্যন্ত গ্রাম ওড়াকান্দি তে যা বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এই গ্রামের পার্শ্ববর্তী সফলাডাঙ্গা গ্রামে জন্ম হয়েছিল মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের। তাঁর প্রচারিত ধর্ম ক্রমশঃ মতুয়া ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।   •    হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম দর্শনকে সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম  (১)  বলে অভিহিত করেছেন, এবং তার প্রচারিত এই ধর্মদর্শনের মাধ্যমে বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন  (২)  করার কথা বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই তার ধর্ম দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক।   •    তিনি বেদ বর্জন করতে বলেছেন অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম ও তার বিধান পরিহার করে চলার কথা বলেছেন এবং বৈদিকতা মুক্ত জীবন যাপন করার কথা বলেছেন। (৩) •    আমরা জানি যে, বেদের গর্ভেই বর্ণবাদের উৎপত্তি, বর্ণবাদ থেকে জাত পাত প্রথার উৎপত্তি যা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে দূষিত দুর্গন্ধ ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। এই বর্ণবাদ ও জাতপাত প্রথার কারণেই ভারতের একশ্রেণীর মানুষ বর্ণবাদের পীড়নে নির্যা...

পুরুষসূক্ত-র প্রকৃত ব্যাখ্যা

 "ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীৎ বাহু রাজন্যকৃতঃ।  ঊরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রো অজাযত।।" অর্থাৎ, পুরুষের মুখ হতে ব্রাহ্মণ, বাহু হতে ক্ষত্রিয়, উরু হতে বৈশ্য ও পা হতে শূদ্র জন্ম নিয়েছে। যে পুরুষের মুখ হতে বা পা হতে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জন্ম নিয়েছে সেই পুরুষ সম্পর্কে তাদের জন্মদাতা বা পিতা হয়। কিন্ত মা এখানে অনুপস্থিত। অর্থাৎ তাদের মা নেই। মা ছাড়াই তাদের জন্ম হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম যে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের জন্ম হচ্ছে পিতার শরীর থেকে, মাতার শরীর থেকে নয়। অর্থাৎ এখানে জন্মদাতা পিতা রয়েছে, কিন্তু জন্মদাত্রী মাতা নেই। অর্থাৎ এই পুরুষসূক্ত ব্রাহ্মণ ও শূদ্র সৃষ্টির জন্য মায়ের প্রয়োজনীয়তাকে সম্পূর্ণ রকমভাবে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ পুরুষ সূক্ত হলো চরম পুরুষতান্ত্রিক ও নারী বিরোধী একটি তত্ত্ব। অর্থাৎ পুরুষ সুক্তে কেবল পুরুষ আছে নারী নেই, পিতা আছে মাতা নেই। ব্রাহ্মণ আছে, ক্ষত্রিয় আছে, বৈশ্য আছে, শূদ্র আছে - মানুষ নেই। তার কারণ, মানুষের জন্ম তো মাতৃগর্ভ থেকে। যেখানে মা নেই সেখানে মানুষ থাকতে পারে না। মা ছাড়া মানুষের জন্ম হয় কি করে ? অর্থাৎ, আমরা এটা বলতে পারি, মাতৃগর্ভ থেকে...