• হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম দর্শনকে সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম (১) বলে অভিহিত করেছেন, এবং তার প্রচারিত এই ধর্মদর্শনের মাধ্যমে বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন (২) করার কথা বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই তার ধর্ম দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
• তিনি বেদ বর্জন করতে বলেছেন অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম ও তার বিধান পরিহার করে চলার কথা বলেছেন এবং বৈদিকতা মুক্ত জীবন যাপন করার কথা বলেছেন। (৩)
• আমরা জানি যে, বেদের গর্ভেই বর্ণবাদের উৎপত্তি, বর্ণবাদ থেকে জাত পাত প্রথার উৎপত্তি যা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে দূষিত দুর্গন্ধ ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। এই বর্ণবাদ ও জাতপাত প্রথার কারণেই ভারতের একশ্রেণীর মানুষ বর্ণবাদের পীড়নে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। এই ধর্ম নামক নরকযন্ত্রণা থেকে এই নির্যাতিত নিষ্পেষিত মানুষদেরকে তিনি উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন “নীচ হয়ে করিবো নীচের উদ্ধার” (৪) । যে ধর্মীয় পীড়নযন্ত্র এই ‘পতিত’ মানুষদের ‘পতিত’ করে রেখেছে সেই বর্ণবাদ নামক পীড়নযন্ত্রকে তিনি বিকল করতে চেয়েছিলেন। এই বর্ণবাদ নামক পীড়নযন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে “বেদ” নামক কারখানায়,যার আবিষ্কর্তা ও প্রয়োগকর্তা হল ব্রাহ্মণরা। তাই তিনি বেদ ও ব্রাহ্মণকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছেন। কারণ বেদের মনুষ্যত্ব বিরোধী বর্ণবাদ ও সেই বর্ণবাদের প্রয়োগকর্তা তথা বৈদিক বিধানদাতা মনুষ্যত্ব বোধহীন ও মানবতার চরম শত্রু ব্রাহ্মণের হিংসা ও ঘৃণার বিদ্বেষে আপামর ভারতবাসী মানুষ থেকে শূদ্র, অস্পৃশ্য, পতিত ইত্যাদি হীন পরিচয়ে অবনমিত হয়েছিল। মানুষ হিসেবে যাদের মূল্য বা সম্মান বলে কিছুই ছিল না। মনুষ্যত্ব বা মানবতা ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিল। মানবতার এই চরম অপমান, মানুষের এই চরম অবনমন হরিচাঁদ ঠাকুর কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। মনুষ্যত্বের এই চরম অবমাননা থেকে তিনি ভারতের নিষ্পেষিত মানব জাতিকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। আর সেই কাজ করার জন্য তিনি নতুন ধর্মদর্শন প্রচার করেন, যে ধর্মের শুরুতেই তিনি মানবতার সকল অপমান ও অবমাননার কারণ বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন করতে বলেছেন।
• আমরা জানি ঋকবেদের দশম মন্ডলের পুরুষসূত্বে চতুর্বর্ণ সৃষ্টির এক কল্পিত আজগুবি উদ্দেশ্য প্রণোদিত অবাস্তব তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়েছে-
• “ব্রাহ্মণোহস্য মুখোমাসীদ্বাহু রাজন্যঃ কৃতঃ।
ঊরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রো অজায়ত।।১২“ (৫)
নীহাররঞ্জন রায় তাঁর “বাঙালী হিন্দুর বর্ণভেদ” গ্রন্থে এই জাতপাত ও বর্ণবাদকে সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক ও অলীক বলে বর্ণনা করেছেন।(৬)
শিবরাম চক্রবর্তী বলেছেন,”শোষণের জন্যই শাসন – এই সনাতন মূলনীতির মূলাধার ব্রাহ্মণ। শোষণকে প্রচ্ছন্ন করতে হলে শাসনকে একটা আদর্শের নামে খাড়া করতে হয়”।
বর্ণবাদ আর জাতপাত হচ্ছে সেই শোষণের আদর্শ। বেদ, মনুসংহিতা ইত্যাদি বৈদিক ও বর্ণবাদী গ্রন্থগুলি সেই শোষণের আদর্শকে সমাজে রোপণ করার চেষ্টা করে গেছে যুগ যুগ ধরে। এদেশের মানুষ যা কখনো স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয় নি।
• সুদূর অতীত থেকে ভারতে বেদবিরোধী, ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী যে বিভিন্ন প্রতিবাদী ধর্মমত বা দর্শনের উদ্ভব হয়েছিল (চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ ইত্যাদি) এবং ব্যাপকভাবে তা ভারতীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ও বিস্তার লাভ করেছিল পরবর্তীকালে তারই কোন এক সূত্র ধরে এবং তারই উত্তরসূরী হিসেবে হরিচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে মতুয়া ধর্ম বাংলার মাটিতে আবির্ভূত হয়েছিল ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।
• পাল শাসনের পর বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয়। সেন বংশের শাসনে বাংলায় বর্ণবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ধ্যানধারণা, রীতি, প্রথা, সংস্কার ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। বল্লাল সেন প্রবর্তিত কৌলিন্য প্রথার মাধ্যমে তা চরমতম স্তরে পৌঁছেছিল (৭) । এর ফলে বাংলার তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষের জীবন চরম শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল। সেন শাসনের চরম ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় ও সামাজিক কঠোরতার ফলে পূর্বের পাল শাসনে বৌদ্ধ যুগের উদার,সাম্যবাদী ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ অন্তর্হিত হয়েছিল। সেন শাসনের কট্টর বর্ণবাদ ও জাতপাতক্লিষ্ট পরিবেশ সেন যুগের পরবর্তীতেও মুসলিম ও ব্রিটিশ যুগেও সমাজের প্রচলিত রীতি, বিধান ও সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
• বাংলার এই বর্ণবাদী সামাজিক সংস্কৃতি হরিচাঁদ ঠাকুর মেনে নিতে পারেননি। তিনি এই বিভেদকামী বর্ণবাদী সাংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। চার্বাক, মহাবীর, গৌতম বুদ্ধ প্রমুখরা বিভেদকামী বৈদিক ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনকালে, সেন বংশের শাসকরা বাংলায় যে বিভেদগামী ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি বাংলার মাটিতে প্রতিষ্ঠা করে রেখে গিয়েছিলেন, হরিচাঁদ ঠাকুর তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এই কুৎসিত সংস্কৃতিকে বাংলা তথা ভারতের মাটি থেকে নির্মূল করার জন্য তার সেই মিশন অনেকটাই সফল হয়েছে। দিকে দিকে শুরু হয়েছে বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জিত অনুষ্ঠান, যা ক্রমাগত বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন উৎসবে বা আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে।
• এবার আসি সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মের কথায়। এই বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝলে মতুয়া ধর্মকে সঠিকভাবে ও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যাবে না। মতুয়া ধর্মকে কেন সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম বলা হচ্ছে ?
• সূক্ষ্ম কথার অর্থ সঠিক। আর সনাতন বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে এদেশের নিজস্ব প্রাচীন ঐতিহ্য সংস্কৃতি যা যুগ যুগ ধরে বহমান, যা পরিবর্তিত বা বিকৃত হয়ে বর্তমানে তার নিজস্ব রূপ হারিয়ে ফেলেছে বা আসল রূপ ভেজালের বোঝার তলে চাপা পড়ে গেছে। সেই আসল রূপকে বলা হয়েছে সূক্ষ্ম সনাতন। এই সূক্ষ্ম সনাতনকে খুঁজে বের করে তার আসল রূপকে জগতের সামনে তুলে ধরার জন্যই মতুয়া ধর্মের আবির্ভাব।
• ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্ম-ঐতিহ্য যা-ই বলি, তার নিজস্ব রূপই হলো সূক্ষ্ম সনাতন। ভারত মাতার গর্ভে যে সংস্কৃতি, যে সভ্যতা জন্ম নিয়েছে তাই-ই সূক্ষ্ম সনাতন সংস্কৃতি বা সভ্যতা।
• কিন্তু এই সূক্ষ্ম সনাতনকে আমরা বর্তমানে হারিয়ে ফেলেছি বা ভুলে গেছি। কারণ ?
• এর কারণ খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাবো –
• যুগে যুগে ভারতভূমি বহু বৈদেশিক বহিঃজাতির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এই প্রতিটা বৈদেশিক আক্রমণের দ্বারা ভারতের সূক্ষ্ম সনাতন সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্ম বিপন্ন ও বিধ্বস্ত হয়েছে বার বার। তারা এদেশের মূল সংস্কৃতি (সূক্ষ্ম সনাতন সংস্কৃতি)-কে মুছে দিয়ে নিজ নিজ দেশের সংস্কৃতির দ্বারা এ দেশের সংস্কৃতিকে আচ্ছাদিত করতে চেয়েছে বা বিকৃত করতে চেয়েছে।
• এই বহিরাগত আক্রমণ যবে থেকে শুরু হয়েছে তবে থেকেই এইসব বহিরাগত আক্রমণকারীদের দ্বারা ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে মুছে দেওয়ার বা বিকৃত করার বা চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে আসছে।
• ভারতের উপর বহিঃশত্রুর সর্বপ্রাচীন যে আক্রমণের কথা আমরা জানতে পারি তা হল আর্য আক্রমণ। (৮) এই আর্য বা বৈদিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহকদের আক্রমণ প্রথম আছড়ে পড়েছিল এদেশের বুকে, যা এদেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বহুল পরিমাণে নষ্ট করেছে, ধ্বংস করেছে, বিকৃত করেছে ও চাপা দিয়েছে। এই আর্য বা বৈদিক আক্রমণকারীদের আক্রমণের পূর্বে এ দেশে এক উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল (৯) যা এই যাযাবর অসভ্যদের আক্রমণে ও যুগ যুগ ধরে তাদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও অপসংস্কারের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেই সঙ্গে অবসান ঘটে ভারতবর্ষের এক গৌরবময় সভ্যতার, এক গৌরবময় সংস্কৃতির। এই আর্য আক্রমণের পূর্বের ভারতের ঐ উন্নত সভ্যতা সংস্কৃতিই হচ্ছে সূক্ষ্ম সনাতন সংস্কৃতি।
• সেই সংস্কৃতির উৎকর্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। পৃথিবীর সমকালীন অন্যান্য সভ্যতার থেকে তা ছিল অনেক দিক দিয়ে অনেক বেশি উন্নত ও অগ্রগণ্য (১০) । হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, কোটদিজি, লোথাল, বানিয়াল, চানহুদরো প্রভৃতি স্থানের প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তার জ্বলন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।
• এই সভ্যতা ও তার সংস্কৃতির সঙ্গে বৈদিক সভ্যতা ও তার সংস্কৃতির তুলনা করলে দেখা যাবে বৈদিক সভ্যতা এর সঙ্গে কোন তুলনায় আসারই যোগ্য ছিল না। (১১)
• এই নগর সভ্যতা ছিল উন্নত জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি জ্ঞানের দ্বারা সমৃদ্ধ। তাই তারা উন্নত ও পরিকল্পিত নগর সভ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। কৃষি, বাণিজ্য, বাণিজ্যে সীলমোহরের ব্যবহার, খেলনা নির্মাণ, পোশাক শিল্প, অলংকারশিল্প, সর্বোপরি তাদের স্থাপত্য শিল্প-নিপুণতা উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয় কোনমতেই। সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য সামুদ্রিক জাহাজ নির্মাণ দক্ষতা তাদের উন্নত প্রযুক্তি কুশলতার পরিচয় বহন করে। নগর পরিকল্পনা, পাকা ইটের বহুতল নির্মাণ, পরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ, উন্নত স্নানাগার, শস্যাগার নির্মাণ তাদের স্থাপত্য ও প্রযুক্তি কুশলতার পরিচয় বহন করে।
• উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে তাদের মধ্যে উন্নত দার্শনিক চেতনার বিকাশও ঘটেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। পরবর্তী ভারতবর্ষ সেই উৎকর্ষতা থেকে অনেকটাই স্খলিত হয়েছিল বলা যায়। কারণ এই নগর সভ্যতা ধ্বংস হবার পরবর্তীতে পরবর্তী নগর সভ্যতা যা গাঙ্গেয় উপত্যকায় গড়ে উঠেছিল তা ছিল অনেক পরবর্তীকালের । অর্থাৎ, এই অন্তর্বর্তী সময়ে ভারতীয় সভ্যতার যে একটা অবনমন ঘটেছিল তা সহজে অনুমান করা যায়।
• কেন এই অবনমন ?
• এই অবনমনের কারণ ছিল বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ। এই বহিরাগত আক্রমণকারীরা ছিল যাযাবর ও অসভ্য, যাদের আমরা আর্য বলে জানি। তারা ছিল পশুপালক, সভ্যতা-সংস্কৃতির নিরিখে অনেক অনেক অনুন্নত। শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা তাদের মধ্যে ছিল না, তারা জানতো না লেখাপড়া, তাদের ছিল না নিজস্ব লিপি, তাদের ছিল না কোন সভ্যতা-সংস্কৃতি। নগর সভ্যতা তাদের কল্পনাতেও ছিল না। তারা ছিল পশুপালক যাযাবর, বাস করত তাঁবুর নিচে।
• এমন একটা অসভ্য, অনুন্নত ও অসংস্কৃত যাযাবর জাতির আধিপত্য এদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে পূর্বের সুসভ্য, সুসংস্কৃত ও উন্নত সভ্যতা সংস্কৃতি চাপা পড়ে গেল। ফলে ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিতে অবনমন দেখা দিল। তাই হরিচাঁদ ঠাকুর পূর্বের সেই ভেদাভেদহীন, সুসভ্য, সাম্যবাদী সমাজ ও সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছিলেন সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
• ভারতে অসভ্য যাযাবরদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে ভেদাভেদ, বর্ণবাদ, জাতপাত, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রথা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে দূষিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছিল (১২)। বৈদিক ভেদাভেদ ও বর্ণবাদে কলুষিত এই যুগকে তাই সহজেই “ভারতের অন্ধকারময় যুগ” হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বৈদিক বর্ণবাদ ও জাতপাতের দ্বারা দূষিত এই “অন্ধকারময় যুগ”থেকে ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে মুক্ত করার জন্য, এই অন্ধকার যুগের অন্ধকারে নিমজ্জিত, নিষ্পেষিত মানবাত্মার মুক্তির জন্য হরিচাঁদ ঠাকুর সুক্ষ সনাতন ধর্ম মতুয়া ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন। এই মানব মুক্তির ধর্মের সাহায্যে তিনি দলিত,পতিত, শোষিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত মানবজাতিকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন বর্ণবাদের অন্ধকার গুহা থেকে, জাতপাতের পৈশাচিক শৃঙ্খল থেকে। বর্ণবাদী অক্টোপাসের বিষাক্ত আলিঙ্গন থেকে তিনি ভারতীয় মানবাত্মাকে মুক্ত করার জন্য বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। এবং বৈদিক ধর্মাচার ত্যাগ করে সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মাচার তথা মতুয়া ধর্ম নামে আলাদা ধর্মাচারের প্রবর্তন করেন। বেদ ও ব্রাহ্মণের স্পর্শ বা ছোঁয়াচ থেকে মুক্ত করে প্রাচীন অবৈদিক সনাতনে ফিরে যাওয়াই ছিল তার প্রবর্তিত ধর্মের মূল লক্ষ্য।
• বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন করার আহবান ছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। কারণ বেদ ও বৈদিক সংস্কৃতি ও বেদে উল্লিখিত বৈদিক দেবদেবী ও বৈদিক দর্শন – এর কোনটাই ভারতীয় ছিলনা বা এর সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির, ভারতের জল বাতাস, মাটির কোন সম্পর্ক ছিল না। বেদ ও বৈদিক দর্শন ছিল সম্পূর্ণভাবে অভারতীয় বা ভারত বহির্ভূত ধর্ম দর্শন। বেদের প্রধান প্রধান দেবতা ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র – এরা ছিল তুর্কি দেবতা, তুরস্ক থেকে আগত। তুরস্কে প্রাপ্ত বোঘাজকোই লিপি আবিষ্কারের পর তা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেছে। (১৩) (বোঘাজকোই লিপিতে লৌহ যুগের সূচনা পর্বের প্রাচীন তুরস্কের দুইজন রাজার সন্ধি চুক্তির কথা বলা আছে। সেখানে তারা তাদের উপাস্য ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, মিত্র ও নাসাত্যাকে সাক্ষী রেখে বা স্মরণ করে চুক্তিপত্র সম্পাদন করছে)। এদেশে বেদ প্রচলনের মধ্য দিয়ে এই তুর্কি দেবতাদের যারা এদেশে প্রচলন করার চেষ্টা করেছে সেই বৈদিক ধর্মানুসারীরাও আসলে ছিল তুর্কি অর্থাৎ তুরস্ক থেকে আগত। তৈমুর মামুদ বাবরদের পূর্বপুরুষ।
• এ থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, আমরা এতদিন ধরে যাদের আর্য বলে জেনে এসেছি তারা আসলে তুরস্ক থেকে আগত তুর্কি। বোঘাজকোই লিপিই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দেয়। তারা তুরস্ক থেকে এদেশে এসে ধীরে ধীরে ছলে বলে কৌশলে এদেশের রাজ ক্ষমতা দখল ক’রে বেদ ও বৈদিক বর্ণবাদ ও তার বিধান এ দেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে এদেশের মানুষকে মানুষ থেকে শূদ্রে অবনমিত করে এ দেশের মানুষের উপর চিরস্থায়ী শাসন শোষণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বৈদিক ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে এদেশের মানুষের উপর রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক শোষণ চিরস্থায়ীভাবে কায়েম করেছে। অর্থাৎ, বৈদিক বর্ণবাদী শাসনের মাধ্যমে এদেশের মানুষের উপর আসলে তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারিয়ে তুর্কিদের অধীন হয়েছে অর্থাৎ পরাধীন হয়েছে। অর্থাৎ, বৈদিক বর্ণবাদী আধিপত্য প্রকৃতপক্ষে তুর্কি আধিপত্য এবং এ দেশের মানুষের পরাধীনতা। অর্থাৎ, বৈদিক বর্ণবাদের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ আসলে তুর্কিদের পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হয়েছে এবং এই পরাধীনতার চিহ্নস্বরূপ শূদ্রত্ব ও অস্পৃশ্যত্ব প্রাপ্ত হয়েছে। এগুলো আসলে পরাজিত ও বন্দী দাসত্বের চিহ্ন।
• অর্থাৎ দুটি বিষয় খুব স্পষ্ট ভাবে অনুধাবনীয়-
• এক, বৈদিক বর্ণবাদ = তুর্কী শাসনবিধান ও তুর্কী আধিপত্য।
• দুই, শূদ্রত্ব/অস্পৃশ্যতা = তুর্কীদের দ্বারা পরাধীনতার বা আত্মসমর্পণকারী দাসত্বের চিহ্ন বা প্রতীক।
• এটুকু কথা বুঝলে আপনারা একথা স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে, হরিচাঁদ ঠাকুর কেন বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন করতে বলেছিলেন। এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের এই আহবান কেন বৈপ্লবিক।
• হরিচাঁদ ঠাকুরের এই আহ্বান ছিল তুর্কি আধিপত্যকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আহবান, এই আহব্বান ছিল তুর্কি পরাধীনতা থেকে মুক্তির আহ্বান, এই আহ্বান ছিল তুর্কি অধীনতার শৃংখল চিহ্ন শূদ্রত্ব, অস্পৃশ্যত্ব মুছে ফেলার আহ্বান। এই আহ্বান ছিল স্বাধীনতার আলোয় বিকশিত হওয়ার আহ্বান। এই আহ্বান ছিল আত্মমর্যাদার গরিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার আহবান।
• আপনারা একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে এদেশের মানুষ কিন্তু এখনও ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, মিত্র এসব বৈদিক দেবতার পূজা করেনা। আগেও করতো না, কোনদিনও করেনি বা করতে রাজি হয়নি। এদেশের মানুষ বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, মিত্র কে কখনোই নিজেদের উপাস্য করেনি বা পূজার আসনে বসায়নি। কেন ?
• কারণ, এরা ছিল বহিরাগত, বাইরে থেকে আগত। এরা এদেশের মানুষের নিজস্ব দেবতা ছিল না। এদেশের মানুষের নিজস্ব দেবতা বা উপাস্য কারা ছিল তার আভাস পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ন নিদর্শনের মধ্যে বা প্রান্তিক মানুষের ধর্মাচারের মধ্যে। সেটাই সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম, যা হরিচাঁদ ঠাকুর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
* সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ন নিদর্শন এর মধ্যে একটি নিদর্শন আমরা পাই যাকে আমরা নাম দিয়েছি পশুপতি শিব। হিন্দুরা শিবের পূজা করে, যে শিবের বাহন হচ্ছে ঋষভ বা ষাঁড়, তাই শিব হলেন ঋষভনাথ। একটু খেয়াল করুন, জৈন ধর্মের প্রবর্তক তথা জৈন ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্করের নাম হল ঋষভনাথ। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত এই পশুপতি শিব এবং হিন্দুদের উপাস্য শিব এবং জৈন ধর্মের প্রবর্তক ঋষভনাথ আসলে অভিন্ন একই ব্যক্তি। মহাবীর ছিলেন খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মানুষ। তিনি ছিলেন জৈন ধর্মের ২৪ তম তীর্থঙ্কর। তাহলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে জৈন ধর্মের প্রবর্তক বা জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর সিন্ধু সভ্যতার যুগের হাওয়াই স্বাভাবিক। তাই সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থল থেকে যে পশুপতি শিবের মূর্তিটি পাওয়া গেছে সেটা আর কারোর নয়, সেটা আসলে জৈন ধর্মের প্রবর্তক তথা জৈন ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথেরই মূর্তি। আর এই ঋষভনাথ প্রবর্তিত ধর্মই ছিল ভারতের প্রাচীন আদি সনাতন ধর্ম, হরিচাঁদ ঠাকুর যাকে বলেছেন সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম। এই ধর্মেরই একটি প্রক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে আমরা দেখতে পাই হিন্দু ধর্মকে, যার প্রধান উপাস্য হলেন শিব, হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত আপামর ভারতবাসীর দ্বারা যিনি পূজিত হয়ে আসছেন সুদূর অতীত থেকে। বেদ বা বেদের বর্ণবাদ তাই এ ধর্মের অংশই নয়। পরবর্তীকালে বেদ ও বেদের বর্ণবাদকে এই হিন্দু ধর্মের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেটা আসলে একটা অপপ্রচার বা জবরদস্তিমূলক মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। হিন্দু ধর্ম, যার উপস্য শিব অর্থাৎ ঋষভনাথ, সে ধর্মটা আসলে জৈন ধর্মের একটি প্রক্ষিপ্ত অংশ বা শাখা বলা যেতে পারে। আর বেদ সম্পূর্ণ আলাদা ধর্ম, তুরস্ক থেকে আগত একটা ধর্ম, যার গ্রন্থের নাম হচ্ছে বেদ, সেই বেদে ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের কোন চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রকৃতপক্ষে ভারতের সনাতন ধর্মের এই ক্রমটাকে বুঝতে হলে আর একটু খোলসা করে বলা দরকার। আসলে ঋষভনাথ যে ধর্মটি প্রচার বা প্রবর্তন বা সূচনা করেছিলেন সেটাকে জৈন ধর্ম না বলে সনাতন ধর্ম বা ভারতের আদি ধর্ম বললে বুঝতে সুবিধা হয়, পরবর্তীতে মহাবীরের হাত ধরে যা জৈন ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ২৪ তম তীর্থঙ্কর হিসেবে জৈন ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে মহাবীরের উত্থান ঘটে বৈদিক ধর্মের প্রতিক্রিয়ায়। কিন্তু ঋষভনাথ যে সময় ভারতকে সনাতন ধর্মের বাণী শুনিয়েছিলেন সে সময় এ ভারত ভূমিতে বৈদিক ধর্ম বলে কিছু ছিল না। ঋষভনাথের ধর্ম আর মহাবীরের ধর্মের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জৈন ধর্মে চতুর্যাম বলে আমরা যে আদর্শের কথা জানি, বলা হয় এই চতুর্যাম তত্ত্ব প্রচলন করেছিলেন পার্শ্বনাথ, যিনি জৈন ধর্মের ২৩ তম তীর্থঙ্কর বলে সুবিদিত। কিন্তু সম্ভবত পার্শ্বনাথ এই চতুর্যাম তত্ত্বের প্রবর্তক নয়, বরং প্রচারক। বা প্রবর্তক হলেও এর মূল বক্তব্যগুলির উৎস হিসেবে কাজ করেছিল ঋষভনাথের শিক্ষা। সেটা একটু বিশ্লেষণ করা যাক- চতুর্যাম হল, অহিংসা, সত্যবাদিতা, অচৌর্য্য, অপরিগ্রহ। হিংসা না করা অর্থাৎ প্রাণী হত্যা না করা। মিথ্যা কথা না বলা বা সত্যের পথে চলা। চুরি না করা বা লুন্ঠন না করা। অন্যের জিনিসের প্রতি লোভ না করা বা না বলে অন্যের সম্পত্তি না নেওয়া বা নিজের জন্য সম্পত্তি না রাখা। এই মৌলিক নীতিগুলি কেন বিকাশ লাভ করেছিল ? ঋষভনাথ ছিলেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ। এই যুগে একদল মানুষ কৃষিকাজ শেখে, কুটির বেঁধে বাস করতে শেখে, সভ্য হতে শুরু করে, সভ্য জীবন যাপনের মধ্যে প্রবেশ করে, এদের মধ্যে সভ্যতার বিকাশ ঘটে। নব্য প্রস্তর যুগের পরবর্তীকালে কৃষিকাজের বিকাশের মধ্য দিয়ে নতুন যুগ শুরু হয়। সিন্ধু সভ্যতা ছিল তার ঠিক পরবর্তী তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতা। একদল মানুষ সভ্য হয়, কিন্তু আরেক দল মানুষ অসভ্য যাযাবর বর্বর থেকে যায়। তাদের কাজ ছিল সভ্য মানুষের উপর আক্রমণ করা, অকস্মাৎ হামলা চালিয়ে তাদের ধনসম্পদ লুট করা, হত্যা করা, অর্থাৎ যে কোন উপায়ে বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করা। সম্ভবত এই অসভ্য মানুষগুলোকে সভ্য করার জন্য এবং এই অসভ্য মানুষের অসভ্যতা থেকে সভ্য মানুষকে এবং সভ্য মানুষের সভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য ঋষভনাথ যে নৈতিক শিক্ষা প্রচলন করেছিলেন সেটাই ছিল ভারতের আদি সনাতন ধর্ম। ঋষভনাথকে প্রথম তীর্থঙ্কর হিসেবে মান্যতা দিয়ে মহাবীর পর্যন্ত ২৪ জন তীর্থঙ্কর যে ধর্ম নির্মাণ করেছিলেন সেটা জৈন ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু ঋষভনাথকে আদি পুরুষ হিসেবে মেনে নিয়ে, এবং তার বাণীতে পাথেয় করে, তার পরবর্তী অন্য কাউকে স্বীকার না করে, কেবল তাকে এবং তার প্রবর্তিত বাণীকে অনুসরণ করে যে ধর্ম বিকাশ লাভ করে কাল ক্রমে সেটাই হিন্দু ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অবশ্য ঋষভনাথ এখানে শিব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং হিন্দুদের উপাস্য দেবতা হয়ে ওঠেন। যে হিন্দু ধর্ম সনাতন ধর্ম নামেও পরিচিত। কিন্তু পরবর্তীকালে বেদ ও বৈদিক ধর্ম দর্শন ভেজাল হিসেবে এর মধ্যে ঢোকে, যা হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্মের সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে। কিন্তু ভেজাল ভেজালই, সেটাকে বাদ দিলে যেটা থাকে সেটাই আসল হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ধর্ম। সংক্ষেপে সনাতন ধর্ম বা জৈন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে স্পষ্ট পরিষ্কার স্বচ্ছ ধারণা হলো এটাই।
ঋষভনাথের যে মূর্তি সিন্ধু সভ্যতা থেকে পাওয়া গেছে বা মহাবীরের মূর্তি বা পার্শ্বনাথের মূর্তি আমরা দেখি সেখানে দেখি তাঁরা যোগাসনে বসে আছেন। এরা ছিলেন আসলে যোগী। বর্তমানে যে যোগব্যায়াম বা যোগাসন ভারত তথা বিশ্বে সমধিক পরিচিত সেই যোগ বা যোগশাস্ত্রের প্রবর্তক বা আবিষ্কর্তা ছিলেন ভারতের এই প্রাচীন যোগীরা। ঋগ্বেদের সাক্ষ্য দেখে দেখা যায়, ইন্দ্র পুর আক্রমণ করছেন আর সেই পুরের যোগীদের হত্যা করছেন। কারণ এই যোগীদের ধর্মমত ছিল ইন্দ্রের ধর্ম থেকে ভিন্ন।
ঋষভনাথের মূর্তি ভারতের মাটির তলা থেকে বেরিয়েছে, ঋষভনাথ শিব হিসেবে ভারতের আপামর মানুষের দ্বারা পূজিত হন, কিন্তু বেদ বা বৈদিক ধর্মের কোন নিদর্শন ভারতের মাটির তলা বা মাটির উপর থেকে পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে তুরস্কের বোঘাজকোই থেকে। তাই সিন্ধুর সভ্যতার যুগের সেই ধর্ম, ঋষভনাথ প্রবর্তিত সেই ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়া ধর্ম প্রবর্তন করলেন।
• এদেশের মানুষ ইন্দ্র,বরুণ, অগ্নি, মিত্র ইত্যাদি বহিরাগত বৈদিক দেবতার উপাসনা না করলেও ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা কিন্তু আপনার অজান্তে সেটা করে দিচ্ছে যখন আপনি তাদের ডেকে আনছেন পুজো দিতে। ধরুন আপনি শিবের পুজো দিতে তাদের ডাকলেন। তারা কিন্তু শিবের পূজো করছে না, শিবের পূজোর অভিনয় করছে মাত্র। একটু খেয়াল করুন, দেখুন, তারা ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, মিত্রকে উদ্দেশ করে মন্ত্র উচ্চারণ করছে, তারপর শেষমেষ হয়তো একটু লোক দেখানোর মতো করে শিবের নাম উচ্চারণ করছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে এই চালাকি ধরতে পারবেন। আপনি কিন্তু ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি বা মিত্রের পূজো করার জন্য তাকে ডাকেননি, ডেকেছেন শিবের পূজো করার জন্য। কিন্তু কেন সে ইন্দ্র,বরুণ, অগ্নি, মিত্রের নামে মন্ত্র উচ্চারণ করছে ? এর আসল রহস্য হল, শিবকে সে তার উপাস্য দেবতা বলে মনে করে না, তার কাছে তার উপাস্য দেবতা হলো ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র – যারা আসলে বৈদিক দেবতা। তাই ব্রাহ্মণ শিবের পূজা করতে বসে করছে আসলে বৈদিক দেবতা, তার নিজের দেবতা, ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্রের উপাসনা।
• তাই হরিচাঁদ ঠাকুর শুধু বেদ নয়, বেদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণও বর্জন করার কথা বলেছেন।
• এটাই সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মের মূল দর্শন। এটাই মতুয়া ধর্মের মূল বাণী।
• তথ্যসূত্রঃ-
• ১. সরকার তারকচন্দ্র, শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত, আচার্য মহানন্দ হালদার কর্তৃক প্রকাশিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, অনন্ত বিজয় অফিস, বাগেরহাট, খুলনা, ২৫শে ফাল্গুন,১৩৪৭ বঙ্গাব্দ, ইং ১৯৪১.পৃ.২৩
• ২. সরকার তারকচন্দ্র, শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত, আচার্য মহানন্দ হালদার কর্তৃক প্রকাশিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, অনন্ত বিজয় অফিস, বাগেরহাট, খুলনা, ২৫শে ফাল্গুন,১৩৪৭ বঙ্গাব্দ, ইং ১৯৪১.পৃ.৯৪.
• ৩. সরকার তারকচন্দ্র, শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত, আচার্য মহানন্দ হালদার কর্তৃক প্রকাশিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, অনন্ত বিজয় অফিস, বাগেরহাট, খুলনা, ২৫শে ফাল্গুন,১৩৪৭ বঙ্গাব্দ, ইং ১৯৪১.পৃ.১৩৮.
• ৪. সরকার তারকচন্দ্র, শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত, আচার্য মহানন্দ হালদার কর্তৃক প্রকাশিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, অনন্ত বিজয় অফিস, বাগেরহাট, খুলনা, ২৫শে ফাল্গুন,১৩৪৭ বঙ্গাব্দ, ইং ১৯৪১.পৃ.৩৯
• ৫. বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীহিরন্ময়, ঋগ্বেদ সংহিতা, দ্বিতীয় খণ্ড, রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদ অবলম্বনে, প্রকাশক- আবদুল আজীজ আল্ - আমান এম.এ., হরফ প্রকাশনী, এ-১২৬ কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলকাতা-৭০০০০৭, প্রথম প্রকাশ- ২৮ ভাদ্র ১৩৮৩, ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, ৯০ সূক্ত, পৃ.৫৭০
• ৬. রায় নীহাররঞ্জন, বাঙালী হিন্দুর বর্ণভেদ,মুদ্রাকর - শ্রী অসিত কুমার বসু, শক্তিপ্রেস, ২৭/৩ বি, হরি ঘোষ ষ্ট্রীট, কলিকাতা, পৃ.৬
• ৭. হালদার আচার্য মহানন্দ, শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত, প্রকাশক - কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর ও শ্রীমতী মমতা ঠাকুর, পঞ্চম সংস্করণ (পুনর্মুদ্রণ), খৃস্টাব্দ - ২০১৬, মুদ্রণ - মডার্ন প্রেস, ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগনা, পৃ.২৯
• ৮. শর্মা রামশরণ, প্রাচীন ভারত, ভাষান্তর - সুমন চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ৬এ, রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, কলিকাতা - ৭০০০১৩, প্রকাশকাল - ডিসেম্বর, ১৯৮৪, মুদ্রক - অদ্রীশ বর্ধন, দীপ্তি প্রিন্টার্স, ৪,রামনারায়ণ মতিলাল লেন, কলিকাতা- ৭০০০১৪, পৃ.৫৩
• ৯. চট্টোপাধ্যায় সুনীল, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রকাশক - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, আর্য ম্যানসন,(নবম তল), ৬এ, রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, কলিকাতা - ৭০০০১৩, প্রকাশকালঃ প্রথম মুদ্রণ - মে, ১৯৮৩/বি, ষষ্ঠ মুদ্রণ - মার্চ, ১৯৯৫/ই(৩), পৃ.১৮
• ১০. চট্টোপাধ্যায় দেবীপ্রসাদ, “ভারতীয় দর্শন” – প্রথম খণ্ড –ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা-৭০০০৭৩।প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর ১৯৬০।অষ্টম মুদ্রণঃ আগস্ট ২০১২। – দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – পৃ.৪৪
• ১১.সিন্ধু সভ্যতার স্বরূপ ও সমস্যা” –সুর ডঃ অতুল। উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির।সি-৩,কলেজ ষ্ট্রীট মার্কেট।কলিকাতা-৭।প্রথম প্রকাশঃ জৈষ্ঠ্য,১৩৫৭, পৃ.৮৮
• ১২. মহর্ষি ভৃগু, মনুসংহিতা, প্রকাশক - মুখোপাধ্যায় শ্রী সতীশচন্দ্র, বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলিকাতা, ১১৬ নং বহুবাজার স্ট্রীট, মুদ্রণ - শ্রী পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, চতুর্থ সংস্করণ - সন ১৩৩৬,দশম(১২৫), পৃ.৯০০
• ১৩.
Prehistoric India
To 1000 BC,
Piggott Stuart
Penguin Books,
Harmondsworth, Middlesex.
First published 1950,
Reprinted 1952. Page 250
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন