সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পুরুষসূক্ত-র প্রকৃত ব্যাখ্যা

 "ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীৎ বাহু রাজন্যকৃতঃ। 

ঊরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রো অজাযত।।"

অর্থাৎ, পুরুষের মুখ হতে ব্রাহ্মণ, বাহু হতে ক্ষত্রিয়, উরু হতে বৈশ্য ও পা হতে শূদ্র জন্ম নিয়েছে।

যে পুরুষের মুখ হতে বা পা হতে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জন্ম নিয়েছে সেই পুরুষ সম্পর্কে তাদের জন্মদাতা বা পিতা হয়। কিন্ত মা এখানে অনুপস্থিত। অর্থাৎ তাদের মা নেই। মা ছাড়াই তাদের জন্ম হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম যে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের জন্ম হচ্ছে পিতার শরীর থেকে, মাতার শরীর থেকে নয়। অর্থাৎ এখানে জন্মদাতা পিতা রয়েছে, কিন্তু জন্মদাত্রী মাতা নেই। অর্থাৎ এই পুরুষসূক্ত ব্রাহ্মণ ও শূদ্র সৃষ্টির জন্য মায়ের প্রয়োজনীয়তাকে সম্পূর্ণ রকমভাবে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ পুরুষ সূক্ত হলো চরম পুরুষতান্ত্রিক ও নারী বিরোধী একটি তত্ত্ব। অর্থাৎ পুরুষ সুক্তে কেবল পুরুষ আছে নারী নেই, পিতা আছে মাতা নেই। ব্রাহ্মণ আছে, ক্ষত্রিয় আছে, বৈশ্য আছে, শূদ্র আছে - মানুষ নেই। তার কারণ, মানুষের জন্ম তো মাতৃগর্ভ থেকে। যেখানে মা নেই সেখানে মানুষ থাকতে পারে না। মা ছাড়া মানুষের জন্ম হয় কি করে ?

অর্থাৎ, আমরা এটা বলতে পারি, মাতৃগর্ভ থেকে যাদের জন্ম তারা হলো মানুষ। আর পিতার দেহ হতে যাদের জন্ম তারা হলো ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র। পিতার মুখ হতে ব্রাহ্মণের জন্ম, পিতার বাহু হতে ক্ষত্রিয়ের জন্ম, পিতার ঊরু হতে বৈশ্যের জন্ম, আর পিতার পা হতে শূদ্রের জন্ম। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র কেবল পিতার সন্তান, এদের কারোরই মা নেই। তাহলে বলা যায়, যাদের মা আছে, অর্থাৎ যারা মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, তারা কেউ ব্রাহ্মণও নয়, কেউ শূদ্রও নয়, তারা হলো মানুষ। অর্থাৎ বর্ণবাদ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, যাদের জন্ম কেবল পিতার শরীর থেকে, যাদের মা বলে কিছু নেই, বর্ণবাদী পরিচয় হচ্ছে কেবল তাদেরই পরিচয়। মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া মানুষকে তাই বর্ণবাদের আওতায় ফেলা যায় না, বা বর্ণবাদ দিয়ে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না।

তাহলে সমাজে যারা ব্রাহ্মণ বা শূদ্র বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে, আমাদের বিচার করে দেখতে হবে, তাদের জন্ম কিভাবে হয়েছে, তারা কিভাবে জন্ম নিয়েছে। তারা মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে কিনা। যদি তারা মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেয় তাহলে তারা মিথ্যা পরিচয় দিচ্ছে। আর যদি দেখা যায় যে, তারা পিতার মুখ থেকে বা পিতার পা থেকে জন্ম নিয়েছে কেবল তখনই সমাজে তাদেরকে ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হিসেবে গণ্য করা যায়।

কিন্তু বাস্তবে হয়তো দেখা যাবে পিতার মুখ হতে জন্ম নিয়েছে এরকম কোন ব্রাহ্মণকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না বা পিতার পা হতে জন্ম নিয়েছে এরকম কোন শূদ্রকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেন ? তাহলে ব্যাপারটা কি ? তাহলে যারা ব্রাহ্মন বা শূদ্র বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছে তারা মিথ্যা কথা বলছে, মিথ্যাচার করছে। এ বিষয়টি বোঝা খুব জরুরী। মানবজাতি এই আসল সত্যকে না বুঝে যুগ যুগ ধরে মিথ্যার পিছনে ছুটছে।

কারণ, আমরা জানি, একটি প্রজাতির জন্ম যেভাবে শুরু হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেভাবেই চলতে থাকে। মাতৃগর্ভ থেকে যে মানুষ জন্ম নিতে শুরু করেছে তারপর পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সে মাতৃগর্ভ থেকেই জন্ম নিয়ে যাচ্ছে। তাই পিতার মুখ হতে যার জন্ম হয়েছে পরবর্তীতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পিতার মুখ হতেই তার জন্য নেওয়ার কথা।

ফলে শাস্ত্র অনুযায়ী অর্থাৎ ঋকবেদের পুরুষসূক্ত অনুযায়ী সে-ই ব্রাহ্মণ যে তার পিতার মুখ হতে জন্মগ্রহণ করেছে, সে-ই শূদ্র যে তার পিতার পা হতে জন্ম গ্রহণ করেছে, এবং যার কোন মা নেই। অর্থাৎ তাকেই আমরা ব্রাহ্মণ বলে মেনে নেব যে তার পিতার মুখ হতে জন্মগ্রহণ করেছে বা তাকেই আমরা শূদ্র হিসেবে গণ্য করবো যে তার পিতার পা হতে জন্মগ্রহণ করেছে। মায়ের গর্ভ হতে যারা জন্ম লাভ করেছে তারা ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হিসেবে দাবি করলে সেটা মেনে নেওয়ার কোন শাস্ত্রসম্মত বা বেদসম্মত যুক্তি নেই। তাই তা মেনে নেওয়ার কোন প্রশ্নই নেই।

ফলে বর্তমান সমাজে ব্রাহ্মণ শূদ্র বলে যে বর্ণভেদ প্রচলিত সেটা শাস্ত্রসম্মত নয় বা বেদসম্মত নয়। কারণ দেখা যাচ্ছে যারা ব্রাহ্মণ বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে তারা মায়ের গর্ভ হতে জন্মলাভ করেছে, পিতার মুখ হতে নয়। আবার যারা নিজেদের শূদ্র বলে পরিচয় দিচ্ছে তারাও মায়ের গর্ভ হতে জন্ম লাভ করেছে, পিতার পা হতে নয়। তাই এই বর্ণভেদ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যারা এই বর্ণভেদকে সমাজে চালু রাখার চেষ্টা করছে বা সমাজে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকার করছে তাদের শাস্ত্রসম্মত বর্ণবাদ পরিচয়টা শিখিয়ে দেওয়া উচিত। যে ব্রাহ্মণ বলে নিজেকে দাবি করছে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা উচিত যে সে কোথা থেকে জন্মগ্রহণ করেছে ? মাতৃগর্ভ থেকে, নাকি বাবার মুখ হতে ?

আশা করি শাস্ত্র জ্ঞান থাকলে সে নিশ্চয়ই এই প্রশ্নের উত্তর বুঝে যাবে।

তাই স্পষ্ট একথা বোঝা যাচ্ছে যে, বর্তমানে সমাজে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র বলে যে বর্ণবাদ প্রচলিত সেটা সম্পূর্ণই অবৈধ, অযৌক্তিক। শাস্ত্রের সঙ্গে তার কোন সংযোগ নেই। তার পিছনে শাস্ত্রের কোন সমর্থন নেই বা শাস্ত্র সম্মত কোন ভিত্তি নেই। তা সম্পূর্ণ বেদবিরোধী। তাই যারা মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করে সমাজে নিজেদের ব্রাহ্মণ বা শূদ্র বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছে তারা মহাপাতক, মহাপাপী, মহা অধার্মিক। তাদের জন্য নরকবাস একরকম নিশ্চিত।(চলবে)



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরিচাঁদ ও তাঁর সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম

•    মতুয়া ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল পূর্ব বাংলার এক অতি প্রত্যন্ত গ্রাম ওড়াকান্দি তে যা বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এই গ্রামের পার্শ্ববর্তী সফলাডাঙ্গা গ্রামে জন্ম হয়েছিল মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের। তাঁর প্রচারিত ধর্ম ক্রমশঃ মতুয়া ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।   •    হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম দর্শনকে সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম  (১)  বলে অভিহিত করেছেন, এবং তার প্রচারিত এই ধর্মদর্শনের মাধ্যমে বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন  (২)  করার কথা বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই তার ধর্ম দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক।   •    তিনি বেদ বর্জন করতে বলেছেন অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম ও তার বিধান পরিহার করে চলার কথা বলেছেন এবং বৈদিকতা মুক্ত জীবন যাপন করার কথা বলেছেন। (৩) •    আমরা জানি যে, বেদের গর্ভেই বর্ণবাদের উৎপত্তি, বর্ণবাদ থেকে জাত পাত প্রথার উৎপত্তি যা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে দূষিত দুর্গন্ধ ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। এই বর্ণবাদ ও জাতপাত প্রথার কারণেই ভারতের একশ্রেণীর মানুষ বর্ণবাদের পীড়নে নির্যা...

সনাতন ধর্ম ও শিব

  হিন্দু ধর্মটা আসলে কি ? এটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। কেউ বলছে বৈদিক ধর্মই হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে মূর্তি পূজা হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে হিন্দু ধর্ম কোন ধর্মই নয়। আসুন এই প্রশ্নের মীমাংসা করা যাক। প্রথমে আসি বৈদিক ধর্মের প্রসঙ্গে। বেদকে কেন্দ্র করে যে ধর্ম পল্লবিত হয়েছে সেটাকেই অনেকে হিন্দু ধর্ম বলে মনে করেন, বেদকেই হিন্দু ধর্মের ভিত্তি বলে মনে করেন এবং বৈদিক দর্শনকেই হিন্দু ধর্মের দর্শনের ভিত বলে মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, বেদে হিন্দু শব্দের কোন উল্লেখ নেই। বেদের মধ্যে কোথাও মূর্তিপূজা করার কথা বলা নেই। শিব কালি দুর্গা এদের কথা নেই। বেদের মুখ্য দেবতা হলেন ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র এরা। আর বেদের কোথাও এদের মূর্তি করে পূজা করার কথা বলে নেই। বেদে যে ধর্ম উপাসনার কথা বলা হয়েছে তা হলো যাগযজ্ঞ, যজ্ঞের মাধ্যমে উপাসনা। তাহলে হিন্দুরা যে মূর্তি পূজা করে এটা তো বৈদিক ধর্ম সম্মত কোন ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্মে মূর্তিপূজাই প্রধান। হিন্দু ধর্মের সেই মূর্তি পূজায় ইন্দ্রের কোন জায়গা নেই।আবার হিন্দুরা যেসব দেবদেবীর পূজা করে সেই দেবদেবীর কথা বেদে উল্লেখ নেই। বেদে যেসব দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে, ই...