সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কলকাতাকেন্দ্রিক নগরায়ন ও তার সামাজিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব

ভূমিকা

সীমিত কিছু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন, মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নগরায়ন এবং রাজ্যের বাকি গ্রাম গঞ্জের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের উদাসীনতা এরকম বৈষম্যমূলক অবস্থা তৈরি করেছে। সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে আবদ্ধ করার ফলে সমগ্র রাজ্যের অর্থ সম্পদ ও মেধা কলকাতাতে এসে জমা হচ্ছে। সেটা কিরকম তা পরে বলছি। কলকাতার সঙ্গে দুর্গাপুর আসানসোল কল্যাণী বা এরকম কিছু শহরাঞ্চলেও উন্নয়ন কিছু পরিমাণে ঘটেছে, কিন্তু তা কলকাতার মতো ব্যাপক অবশ্যই নয়। উন্নয়ন বা নগরায়ন বলতে আমি যোগাযোগ ব্যবস্থা শিক্ষা স্বাস্থ্য এইগুলিকে বোঝাচ্ছি; সেইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, যদিও তা আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। সেইসঙ্গে আনুষঙ্গিক অফিস-আদালত ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থিতি বা সম্প্রসারণ একটা অঞ্চলের উন্নয়নের উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

                     নগরায়ণের প্রকারভেদ 

                    নগরায়ন দুভাবে সংগঠিত হয় - 

১) স্বতঃস্ফূর্তভাবে- যাকে স্বতস্ফূর্ত নগরায়ন বলা যেতে পারে, যেমন, বিশেষ কোনো বাণিজ্যকেন্দ্র বা যোগাযোগ কেন্দ্র বা প্রশাসনিক কেন্দ্র বা বন্দরকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নগরায়ন ঘটে, যেমন, কোলকাতা, শিলিগুড়ি ইত্যাদি। 

২) পরিকল্পিতভাবে, যাকে পরিকল্পিত নগরায়ন বলা যায়, যেমন, কলকাতার উপকন্ঠে সল্টলেক, নদীয়ার কল্যাণী ইত্যাদি। পরিকল্পিত নগরায়ন উন্নয়নকে যথেষ্ট ত্বরান্বিত করেছে এটা আমরা দেখেছি। পরিকল্পিত নগরায়নকে আরো প্রসারিত করলে উন্নয়নও প্রসারিত হতো এতে কোন সন্দেহ নেই, বিশেষ করে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরবঙ্গ নগরায়ন ও উন্নয়ন থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত বলা যায়।কোন সরকারই এসব এলাকায় নগরায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সেভাবে। এসব এলাকায় নগরায়ন ঘটেনি বলেই দেখা যায় পশ্চিমাঞ্চল বা উত্তরবঙ্গের অনেকেই সম্ভব হলে কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে রাখার চেষ্টা করে কলকাতার উন্নয়নের নাগাল পাওয়ার জন্য। ভালো হাসপাতালগুলো এখানে। ওসব অঞ্চলে ভালো হাসপাতাল তথা উন্নত মানের চিকিৎসা পরিষেবা না থাকার জন্য গুরুতর অসুস্থতায় তাদের কলকাতায় আসতে হয়, তাই কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট থাকলে এক্ষেত্রে সুবিধা হয়। তেমনি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়। এইভাবে নগরায়নের সুবিধা পাওয়ার জন্য তাদের এক্সট্রা পয়সা নষ্ট করতে হচ্ছে। আর  অনগরায়ন এলাকার এই এক্সট্রা পয়সা কলকাতা অঞ্চলের ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের পকেটে উদ্বৃত্ত হিসেবে ঢুকছে। এইভাবে বঞ্চিত এলাকার উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হচ্ছে নগরায়নের সুবিধাভোগী অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের পকেটে। এইভাবে বৈষম্যমূলক নগরায়ন গ্রামাঞ্চলের উদ্বৃত্ত শোষণ করে নগরের সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীদের স্ফীত করছে।

                    বৈষম্যমূলক নগরায়ন ও সমাজব্যবস্থার ভাঙন :-
                    বৈষম্যমূলক নগরায়ন সমাজের ভাঙ্গনকে ত্বরান্বিত করছে দুইভাবে এক গ্রাম্য সমাজের ভাঙ্গন ও 200 হুরে সমাজের ভাঙ্গন।

                    গ্রাম্য সমাজের ভাঙ্গন:-

                    কোলকাতা হতে দূরবর্তী গ্রাম বা গঞ্জ উন্নয়ন বা নগরায়ন থেকে যারা দূরে অবস্থান করে সেখানে সমাজে এক ধরনের ভাঙ্গন ঘটছে ভাঙ্গনের মুখ্য কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অপ্রতুলতা।সচ্ছল ও সচেতন পরিবারগুলি যারা সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থতা কালীন জরুরি চিকিৎসার ব্যাপারেও সচেতন তারা অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে বা নগরে বিশেষ করে কলকাতা বা কলকাতা তুলল নগর গুলিতে নিজেদের আবাসস্থল পরিবর্তন করে চলে আসছেন বাড়ি কিনছেন বা ফ্ল্যাট কিনছেন।
                    গ্রামের শিশু শিক্ষার হাল বর্তমানে তেমন ভালো নয় কোথাও কোথাও একেবারে বেহাল। এলাকা বিশ্বাসে কিছু কিছু স্থানে হয়তোবা ভালো কিন্তু মোটের উপর বলতে গেলে সুবিধের নয়। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:-
                    ১) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সারাবছর ধরে শিক্ষা ব্যতীত অন্যান্য কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে তারা বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না।সারা বছর ধরে জনগণনা ভোট গণনা বা বিভিন্ন প্রকার সমীক্ষা করতে হয়।বিডিও অফিস থেকে মাঝেমধ্যেই তাদের বিভিন্ন কাজ ধরিয়ে দেওয়া হয় বিশেষ করে যে কাজগুলো পরিশ্রম ও সময় সাপেক্ষ ও পারিশ্রমিক কম সে কাজগুলি প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় (আর যে কাজগুলি আয় করা যেতে পারে ও পারিশ্রমিক বেশি সেগুলো বিডিও অফিসের কর্মীরা নিজেরাই করেন)।
                    ২) অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক অপ্রতুল শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। ওর উন্নত এলাকাগুলোতে অবস্থা বেশি খারাপ। এমন অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে যেখানে দুজন এমনকি একজন শিক্ষক। ফলে শিক্ষার্থীর থাকলেও তাদের শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নেই। ফলে এইসব স্কুলগুলিতে পড়াশোনার মান বলে প্রায় কিছুই নেই বললেই চলে। এখানে শিশুরা প্রায় কিছুই শিখছে না।প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দেখা যাচ্ছে এরা বই পড়তে পারছে না কিছু লিখতে পারছে না গণিতবিদ্যা যোগ বিয়োগ গুন ভাগ কিছুই শিখিনি। ব্যতিক্রমী ভাবে দু-একজন হয়তো কিছু শিখছে তাদের পরিবারের সচেতনতা ও নিজস্ব উদ্যোগের ফলে।এরকম ইস্কুল গুলিকে আজকাল লোকে কিছুরই স্কুল বলে কারণ মধ্যাহ্নকালীন ভোজনের ব্যবস্থা স্কুলে চালু হতেই অনেকে এরকম মনে করেন যে এইসব সরকারি স্কুলগুলিতে পড়াশোনা হয় না বা পড়াশোনা করার জন্য কেউ জানা যায় খিচুড়ি ভাত ডাল তরকারি খাওয়ার জন্য। ফলে সচেতন অভিভাবকেরা নিজের সন্তানদের স্কুলে পড়ানোর ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করেন।তারা মনে করেন এরকম স্কুলে পড়ালেখা তাদের সন্তানেরা কিছুই শিখবে না এবং এর ফলে মানুষ হতে পারবে না বা উজ্জ্বল জীবন গড়ে তুলতে পারবে না।তাই তারা সন্তানদের ভালোভাবে শিক্ষাদানের জন্য উন্নত নগরে গিয়ে বাস করার চিন্তা-ভাবনা ও চেষ্টা করছে যেখানে সন্তানদের শিক্ষাদানের জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়।
                    গ্রামের সাধারণত ভালো স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকে না থাকলেও তা 24 ঘন্টা খোলা থাকে না রক্ত সরবরাহ থাকে না অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তার না হয়তো সপ্তাহে একদিন বা দুদিন বাকি দিনগুলোতে ডাক্তারের কাজ করেন।
                    আবার কলকাতা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের শহরেও কলকাতার সমমানের চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।ফলে গুরুতর অসুস্থতা বা জরুরি ক্ষেত্রে সেই সব অঞ্চলের মানুষ উপযুক্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। প্রয়োজনের সময় তাদের সঠিক চিকিৎসা পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে।এই সমস্যার কথা মাথায় রেখে অনেকেই কলকাতা বা কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলে এসে বাড়ি বা ফ্ল্যাট করছেন। ফলে এই ক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের অতিরিক্ত অপচয় হচ্ছে। যেমন উত্তরবঙ্গে ভালো চিকিৎসার সুযোগ নেই।তাই উত্তরবঙ্গের অনেকেই কলকাতা বা কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত পয়সা খরচ করে ফ্ল্যাট কিনে রাখছেন। এতে কলকাতার ফ্যাট ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন এবং কলকাতায় ফ্ল্যাট ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে।এইভাবে সরকারও উন্নয়নকে একটা অঞ্চলে বার্ষিক সীমিত কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রেখে সেই অঞ্চলের অধিবাসীদের নানা রকম ভাবে উন্নত জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন। আর অবশিষ্ট অঞ্চলকে উন্নয়নের বাইরে রেখে সেই সব অঞ্চলের অধিবাসীদের উন্নয়নের লাভ অসুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে ও তাদেরকে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় করে নগরায়ন সুবিধাপ্রাপ্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করছে। এইভাবে বৈষম্যমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে চলছে শহরের দ্বারা গ্রামের শোষণ। এইভাবে গ্রামের কিছু অংশের সচ্ছল বা বর্ধিষ্ণু মানুষজন গ্রাম ছাড়ছে। ফলে গ্রামের জনসমাজে একটা অংশের ভাঙ্গন ঘটছে।

                    শহুরে সমাজের ভাঙ্গন:-

                   পুরনো কলকাতা থেকে বর্ধমানের কলকাতায় অনেক ফারাক। মুহুর্মুহু গড়ে উঠছে ফ্ল্যাট। শহরে হু হু করে ধুঁকছে বাইরে থেকে নতুন নতুন লোকজন। পুরনো বাড়িগুলি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহুতল ফ্ল্যাট। মানুষের ভিড়ে শহরের সমাজ যাচ্ছে হারিয়ে। এখানে সবাই খুব ব্যস্ত। তার থেকেও বড় কথা সবাই নিজেকে নিয়ে যেন অনেক বেশি ব্যস্ত। মানুষের ব্যস্ততার সবচেয়ে বড় কারণ অর্থ বা টাকা। সবাই যেন টাকার পিছনে ছুটছে। শহরের বাতাসে টাকা উড়ছে। সবাই তা ধরার জন্য ব্যস্ত। প্রতিবেশীর সঙ্গে সামাজিকতা করার সময় যেন কারোর নেই। এখানে প্রতিবেশীই বা কে ? এখানে কংক্রিটের দেওয়াল দ্বারা যেন সবাই সবার থেকে বিচ্ছিন্ন। শহরের পরিবর্তন বিশেষ করে বড় শহরগুলির পরিবর্তন এত দ্রুত হচ্ছে যে যেন পরিবর্তনের স্রোতের তোড়ে সবকিছুই ভেসে যাচ্ছে।নিত্যনতুন পরিবর্তন কাল যে প্রতিবেশী ছিল আজ সে নেই কাল যে ছিল না আজ সে ঘুরঘুর করছে আগামীকাল আবার সে থাকবে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।এইযে নিশ্চয়তা হীনতা এখানে সব কিছুই যে অনিশ্চিত ক্ষণিক এটাই শহরের সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সমাজ যেখানে স্থির নয় চলমান সদা পরিবর্তনশীল।
                   শহরের সমাজে কোনো সামাজিক স্থিতিশীলতা না থাকার কারণে এবং সামাজিক স্বাধীনতা অবাধ হওয়ার কারণে পরিবার কাঠামো স্থিতিশীলতাও কম। অর্থাৎ পরিবার ভাঙ্গার হার বেশি।শুধু তাই নয় বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও বিবাহ ছাড়া নারীপুরুষের মেলামেশা ও সম্পর্ক তৈরির হারও বেশি। এবং সেই সব সম্পর্কের ভঙ্গুরতাও বেশি অর্থাৎ স্থায়িত্ব কম।
                   শহরের উন্মুক্ত জীবন, নারী-পুরুষের অবাধ স্বাধীনতা পরিবার কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে সমাজকাঠামোকেও অনেকটা নড়বড়ে করে তোলে। বৈষম্যমূলক নগরায়ন এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে তোলে।কারণ বৈষম্যমূলক নগরায়নের ফলে সীমিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নাগরিক জীবনের সুযোগ পাওয়ার জন্য মানুষের স্থানান্তর বেশি পরিমাণে ঘটে। নগরায়ন আরো প্রসারিত হলে মানুষের স্থানান্তরণ এত বেশি হত না। তখন নিজ এলাকায় থেকে মানুষের নগরায়নের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি তৈরি হতো। ফলে শিখর ওপরানর প্রয়োজন আরো কম ঘটতো।ফলে নিজ এলাকায় থেকে নিজস্ব সমাজ সংস্কৃতির সম্পর্ক অটুট রেখে এসে বাস করতে পারত।ফলে সামাজিক পরিচিতি ও সামাজিক বন্ধনের মধ্যে থাকার কারণে অবাধ উচ্ছন্নে যাওয়ার প্রবণতা কমতো।
                   কিন্তু সীমিত এলাকায় নগরায়নের ফলে এই শিখর উপড়ানোর সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ নিজের শিকড় উপরে যখন নতুন কোন শহরে যাচ্ছে তখন সে এক রকম সামাজিক বন্ধন এর বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে জীবনযাপন আরও বেশি অবাক হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। এরা যেন অনেকটা শিকড় ছেরা ভুঁইফোড় বা ভাসমান কচুরিপানার মতো কোনো বাধা বন্ধন নেই। এর ফলে শহুরে জীবন শহুরে সমাজ যেন অনেক বেশি লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে।ফলে উচ্ছন্নে যাওয়া বা উশৃংখল হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। আর বাস্তবিক অবস্থাও ঠিক তাই।আর এইসব শিকড় ছাড়া লাগামছাড়া মানুষের সমাবেশে যে পরিবার ও যে সমাজ তৈরি হবে তা যে অপেক্ষাকৃত বেশি ভঙ্গুরই হবে সেটাই স্বাভাবিক।
                   বৈষম্যমূলক নগরায়ন ও সামাজিক ব্যবধান:-
                   উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন এবং অগ্রসর ও অনগ্রসর এরা পরস্পর সমানুপাতিক।
                   উন্নয়নের যেখানে হবে সেখানে সামাজিক অগ্রসরতা যেমন ত্বরান্বিত হবে তেমনি অনুন্নয়ন কবলিত এলাকায় মানুষ পিছনে পড়ে থাকবে বা অপেক্ষাকৃত অগ্রসর হয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
                   আবার যারা অগ্রসর তারা উন্নত এলাকায় ভিড় করবে আর যারা অনগ্রসর ও অনুন্নত এলাকায় পড়ে থাকতে বাধ্য হবে এটাই স্বাভাবিক।
                   নগরায়ন মানুষের জীবনে বিপুল পরিবর্তন নিয়ে আসে। জীবন যাপন কর্মসংস্থান সুযোগ-সুবিধা প্রভৃতি বিভিন্ন দিক দিয়ে নগরায়ন মানুষকে অনেকটা এগিয়ে দেয় বা সুবিধা করে দেয়। আর নগরায়ন বঞ্চিত প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। সুষম নগরায়ন না হলে সুষম বিকাশ হয় না। সুষম নগরায়ন বলতে আমি এমন নগরায়ন বোঝাচ্ছি যার ফলে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে নগরায়নের সুফল পৌঁছাবে।অর্থাৎ সীমিত দুই-একটি অঞ্চলে নগরায়নের জোর না দিয়ে সার্বিকভাবে সকল অঞ্চলে নগরায়নের প্রসারিত করলে তাহলে সুষম নগরায়ন সম্ভব হবে।যেমন ধরা যাক এন আর এস এর মতো হাসপাতাল যদি উত্তরবঙ্গে আরেকটা থাকতো বা পশ্চিমাঞ্চলে আরেকটা তৈরি করা যেত তাহলে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার সুষম বন্টন সম্ভব হতো। ফলে সুষম বিকাশ ঘটতো। সবাই সুষমভাবে উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারত। কিন্তু নীলরতন হাসপাতাল শুধু কলকাতাতে একটা সঙ্গে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এসএসকেএম ফলে কলকাতার মানুষ ঘরের পাশে বসে যে সুযোগ পাচ্ছে উত্তরবঙ্গের মানুষ বা পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।সেই সুযোগ পাওয়ার জন্য তাকে এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছে কোলকাতাতে যেখানে তাদের কোন ঠাই নেই। ফলে চিকিৎসার সুযোগ নেওয়ার জন্য তাঁদের অকল্পনীয় কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র এখন গণতান্ত্রিক। কলকাতার একজন মানুষের ভোটের জাদাম কোচবিহারের একজন মানুষের ভোটের সেই একই দাম। কিন্তু সরকার বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে রাজধানী বা রাজধানীর সন্নিহিত এলাকায়। রাষ্ট্র নিজেকে প্রসারিত না করে রাজধানীর উপকণ্ঠে সংকুচিত করে রাখছে।ফলে নগরবাসী ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জীবন যাপনের সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। যা তাদের জীবন যাপনের ধরনের অনেক ব্যবধান তৈরি করছে।
                   ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা (ও রেল ও সড়ক), ভালো চিকিৎসার সুযোগ উচ্চশিক্ষার সুযোগ মূলত এই প্রধান তিনটি ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন যাপনের সার্বিক মান নির্ধারণ করে। আর ব্যবধান তৈরি হচ্ছে মূলত এই ক্ষেত্রগুলিতে। এই তিনটি ক্ষেত্র অন্যান্য ক্ষেত্রের ও নির্ধারক।ফলে এই তিনটি ক্ষেত্রের ব্যবধান অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যবধান তৈরি করছে।অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে মূলত অর্থনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য কর্মসংস্থান জনসচেতনতা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবা ইত্যাদি।
                   নীলরতন আরজিকর এসএসকেএম-এ যে অস্বাভাবিক রোগীর ভিড় তাদের এই বৈষম্যপূর্ণ উন্নয়ন বা নগরায়ন প্রক্রিয়ার ফল। উত্তরবঙ্গে বা রাজ্যের পশ্চিম অংশে যদি আরো কয়েকটা এই মানের হাসপাতাল থাকতো তাহলে ওই অঞ্চলের রোগীরা আর এখানে এসে ভিড় করত না। তারা যেমন কাছাকাছি অঞ্চলের চিকিৎসার সুযোগ পেত, তেমনি কলকাতার এই হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ কমতো এবং আরো ভালো পরিষেবার ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু সরকারের কাজের মধ্যে সে মানসিকতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।এইসব হাসপাতালগুলিতে দূর-দূরান্তের রোগীদের উপচেপড়া ভিড় দেখে মনে হয় এটা যেন রোগী ও রোগীর আত্মীয়দের নিয়ে তামাশা দেখার একটা ব্যবস্থা।
                   বৈষম্যমূলক নগরায়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যায়ণ:-
                   নগরায়ন মানেই উন্নয়ন, উন্নয়ন মানেই সমৃদ্ধি। নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে নগরকে কেন্দ্র করে সকল প্রকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূত্রপাত ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বিভিন্ন প্রকারের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটে। মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নতির রাস্তা খুলে যায়। কর্মসংস্থানের বিভিন্ন দিগন্ত খুলে যায়। জীবন বিকাশের নানাদিক উন্মোচিত হয়ে যায়। জীবনের যাবতীয় সুবিধা ও উপকরণগুলো হাতের নাগালে চলে আসে বা সুলভ হয়ে যায়।
                   কোন এলাকায় নগরায়ন হলে সেই এলাকার আশেপাশে এলাকাগুলোও উপকৃত হয়। এমনকি আশেপাশের গ্রামগুলোও তার ফল ভোগ করে বা তার সুবিধা পায়। গ্রামে উৎপন্ন ফসল বা সবজি বাজারজাত করতে সুবিধা হয়। ফলে উৎপন্ন ফসল নষ্ট হয়না, চাষীও ফসলের ন্যায্য দাম পায়।কিন্তু নগরায়ন বঞ্চিত প্রত্যন্ত গ্রামের চাষীরা তাদের উৎপন্ন ফসল সব সময় বাজারে পাঠাতে পারে না বা বিক্রি করতে পারেনা।ফলে অনেক সময় এই কষ্ট করে উৎপাদিত ফসল বিশেষ করে সবজি নষ্ট হয় বা ন্যায্যদাম এর থেকে অনেক কম দামে বা অতি সস্তায় বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় উৎপাদিত সবজি গরু-ছাগল দিয়েও খাওয়ানো হয়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বারাসাত স্টেশন রোডে বেশ কম দামে সবজি কিনতে পাওয়া যায়। কারণ বারাসাতের পার্শ্ববর্তী গ্রামের চাষিদের উৎপাদিত ফসল সহজেই বারাসাতে আনা যায়। ফলে কম দামে ব্যবসায়ীরা তা বিক্রি করতে পারে। এর ফলে বারাসতবাসীও উপকৃত হয়। অন্যদিকে চাষীরাও তাদের ফসল বিক্রি করতে পারে। কিন্তু দূরবর্তী অঞ্চলের চাষীরা (নগরের বাজার থেকে) দূরত্বের কারণে ফসল বিক্রি করতে পারলেও অপেক্ষাকৃত অনেক কম দামে ছাড়তে হয়।
                   নগরায়নের লাভ নগর সন্নিহিত এলাকার কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি শ্রমিকমজুরদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়।নির্মাণ শিল্প থেকে শুরু করে ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্প, কল-কারখানা, যানবাহন, খালাসী, দোকান বা ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। নগর থেকে অতি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মজুর শ্রমিকরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।কলকাতা দুর্গাপুর কল্যাণী সন্নিহিত অঞ্চলের শ্রমিকরা যে পরিমাণ কাজের সুযোগ পায় হিঙ্গলগঞ্জ বা বাগদা বা গোঘাট অঞ্চলের শ্রমিকরা সেই সুযোগ থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত।
                   নগরায়ন অশিক্ষিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষিত মানুষের জন্য প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি করে, যার বেশিরভাগ সুযোগ পায় নগর সন্নিহিত অঞ্চলের মানুষ। নগরায়নের প্রসার ঘটলে এই কর্মসংস্থানেরও প্রসার ঘটতো। কিন্তু রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলই সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
                   নগরায়ন হলেই নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বণিক শ্রেণী। এটা নগরায়নের সবচেয়ে বড় সুফল। নগরায়নকে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখলে বণিক শ্রেণির সম্প্রসারণকেও সেই সব অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। নগরায়নকে প্রসারিত করলে নতুন নতুন অঞ্চলে এই বণিক শ্রেণী গড়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং নতুন নতুন নগরকে কেন্দ্র করে এরা পুঁজি বিনিয়োগের আরো বেশি সুযোগ পেত। ফলে সেই এলাকায় নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তো। কিন্তু সীমাবদ্ধ নগরায়ন সেই সুযোগকে সংকুচিত করেছে। কোন অনুন্নত অঞ্চলে নগরায়ন হলে সেই এলাকায় ধনী কৃষকদের ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে তারা কৃষক থেকে ব্যবসায়ীতে পরিণত হতে পারে। এর ফলে কৃষিক্ষেত্র থেকে কিছু মানুষ ব্যবসায়ে চলে আসে। এর ফলে কৃষি ক্ষেত্রে কিছু শূণ্যস্থান তৈরি হয়, যা গ্রামের অন্যান্য দরিদ্র লোকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে নারায়ণকে প্রসারিত করার তেমন কোন প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না সরকারের তরফ থেকে।
                   নগরায়ন মানেই যে কলকাতা কল্যানী, দুর্গাপুর বা সল্টলেকের মতো বৃহৎ নগরায়ন ঘটাতে হবে তার কোনো মানে নেই। ক্ষুদ্র আকারেও সেটা করা সম্ভব। অন্ততপক্ষে কোন এলাকায় ভালো একটি হাসপাতাল গড়ে তুললেও তাকে কেন্দ্র করে জীবন যাপনের উৎকর্ষতা বাড়তে পারে। সারা দেশজুড়ে ছোট ছোট নগর গড়ে তুললেও, যেখানে থাকবে একটি ভালো হাসপাতাল, সরকারি কিছু আবাসন, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, জল সরবরাহ, দু'একটি বাজার, খেলার মাঠ সংস্কৃতি কেন্দ্র নগরায়ন ঘটতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের যেমন লাভ, তেমনি এর থেকে প্রচুর লাভ করতে পারে সরকারও, বাড়তে পারে দেশের জিডিপি। দূর হতে পারে বেকার সমস্যা, বাড়ে কর্মসংস্থান, মানুষ পেতে পারে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ।
                   বৈষম্যমূলক নগরায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা:-
                   কোন কিছু যখন সুষমভাবে না হয় তখন ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। নগরায়ন ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। বৈষম্যমূলক নগরায়ন পরিবেশের ভারসাম্যকে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত করে। কোন অঞ্চলে নগরায়ন হলো, আর কোন অঞ্চল রয়ে গেল নগরায়ন থেকে অনেক দূরে, নগরায়ন যেহেতু মানব সমাজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য, তাই যে অঞ্চল নগরায়ন থেকে দূরে অবস্থান করে, সে অঞ্চলের অধিবাসীরা স্থানান্তরিত হ'য়ে নগরায়নের সুবিধা পাওয়ার জন্য নগরে চলে আসে বা চলে আসতে চায়। ফলে নগরে ভীড় বাড়তে থাকে। নগরায়ন যত কম এলাকায় হয়, আর নগরায়ন-বঞ্চিত এলাকা যত বেশি হয় নগরের দিকে ধাবিত এই ভীড়ের ঘনত্বও তত বেশি হয়। কারণ নগর এলাকার তুলনায় নগরায়ন বঞ্চিত এলাকারপরিমাণ বেশি বিস্তৃত হওয়ার কারণে লোক সংখ্যা বেশি হয় ফলে নগরে ভীড় করতে আসা লোকের সংখ্যাও বেশি হয়।
                   কিন্তু নগরায়ন যদি বিস্তৃত অঞ্চল ব্যাপী হয় এবং অনেক জায়গায় হয় তাহলে নগরে ভীড় তত বাড়তে পারে না। কারণ তখন অনেক বেশি মানুষের কাছে নগরের সুফল পৌঁছায়। ফলে তাদের তেমন বেশি স্থানান্তরিত হওয়ার প্রয়োজন হয়না বা অল্প যা কিছু স্থানান্তরিত হয় তার নগরের ভীড়কে অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে না। কারণ সেই ভীড় তখন বিভিন্ন নগরের মধ্যে বিভাজিত হয়ে যায়। আর তাছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সুষম আকারে নগরায়ন হলে অনেক বেশি মানুষের বাড়িতে বসে নগরায়নের সুফল পাওয়ার সুযোগ ঘটে।
                   তাই যে কোন নতুন নতুন নগরায়ন অন্য নগরের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করে। সল্টলেক, রাজারহাট পরিকল্পিত নগর কলকাতার উপর চাপ কমাতে সাহায্য করেছে। এক্ষেত্রে নগরায়নকে ছড়িয়ে দেওয়া গেছে। আবার কল্যাণীতে নগরায়নের ফলেও কলকাতার উপর চাপ কমেছে। এক্ষেত্রে নতুন এলাকায় নগরায়ন ঘটেছে। তেমনি যদি সন্দেশ খালি, ক্যানিং বা সাগরদিঘী এলাকাতে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা যেত তাহলে কলকাতার উপর চাপ আরো কমতো। কারণ এসব এলাকা আধুনিক নগর সভ্যতা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় এসব এলাকার সঙ্গতিসম্পন্ন মানুষ অনেকেই কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু ওইসব এলাকায় নগরায়ন ঘটলে তারা হয়তো কলকাতায় স্থানান্তরিত হতো না।কিংবা পুরুলিয়া বাঁকুড়া দিনাজপুর বা কোচবিহার ইত্যাদি জেলাগুলিতে যদি অনুরূপ পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা যেত তাহলেও কলকাতার উপর চাপ কমতো।কারণ ওইসব এলাকায় কলকাতার মত উন্নত চিকিৎসার পরিসেবা সুলভ না হওয়াতে ওইসব এলাকার অনেকেই কলকাতায় ফ্লাট বা বাড়ি কিনছে শুধুমাত্র চিকিৎসাকালীন সময়ে কলকাতায় একটা থাকার আস্তানা নিশ্চিত করার জন্য। এই ভীড় অস্থায়ী বা সাময়িক হলেও তা অগ্রাহ্য করার মত নয়।
                   মানুষের ভিড় বাড়লে আনুষঙ্গিক পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়। অনেক বেশি যানবাহন ব্যবহৃত হয়, ফলে অনেক বেশি ধোঁয়া ও ধুলো তৈরি হয়ে পরিবেশ দূষণের হারকে বাড়িয়ে দেয়। বেশি গাড়ি মানে বেশি হর্ণ, মানে বেশি শব্দ দূষণ। তাছাড়া মানুষের ভিড় যত বাড়ে মানুষের ব্যবহৃত আবর্জনা, বর্জ্য পদার্থও তত বেশি নিক্ষিপ্ত হয় পরিবেশে। ফলে বায়ু দূষণ, শব্দদূষণ, জলদূষণ, দৃশ্যদূষণ, মাটি দূষণ সমস্ত প্রকারের দূষণ ই ভারাক্রান্ত ক'রে তুলেছে কলকাতার পরিবেশকে।
                   শুধু তাই নয়, কলকাতায় ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসস্থানের চাপ বেড়েছে, এর ফলে ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি বেড়েছে। ফলে যে অঞ্চলে হয়তো কিছু গাছ ঘাস জঙ্গল বা কৃষি ফসল জন্মাতো সেখানে উঠেছে বাড়ি বা ফ্ল্যাট। ফলে বাতাসে অক্সিজেনের যোগান কমেছে, প্রকৃতিতে সবুজ কমেছে, গাছের ছায়া কমেছে, সালোকসংশ্লেষ কমেছে,বাষ্পমোচন কমেছে, বাতাসে কার্বন-ডাইঅক্সাইড বেড়েছে। ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রাও বেড়েছে।
                   শুধু তাই নয়, অত্যধিক মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার জন্য কলকাতায় মাটির নীচে ভূগর্ভে জলের পরিমাণ কমেছে, জলস্তর নিচে নেমেছে, ভূগর্ভের জল দূষণের মাত্রা বেড়েছে।
                   এইসব দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের শরীরের মধ্যে। আক্রান্ত হচ্ছে কলকাতাবাসীর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কিডনি, ফুসফুস।হার্ট হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। এরকম নগরায়ন দিয়ে কি হবে ? যা মানুষের জীবনকে সুখী করে তোলার পরিবর্তে রোগগ্রস্ত করে তুলছে ?
                   এর কারণ হচ্ছে বৈষম্যমূলক নগরায়ন। অর্থাৎ কলকাতার মধ্যে নগরায়নকে সীমাবদ্ধ করার কারণেই মানুষ এই পরিবেশগত কুফলের কবলে পড়ছে। যে মানুষগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কলকাতাতে এসে ভিড় করছে, সেই সব এলাকায় যদি ছোট করেও নগরায়ন হতো, তাহলে কলকাতা বাসীর জীবন এরকম বিষময় হয়ে উঠত না। তাতে কলকাতাবাসীও নগরায়নের মৌজ নিতে পারত, আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও নগরায়নের সুবিধা পেত।
                   নতুন নতুন নগরায়নে সরকারের কোন অপশন নেই বরং আরো লাভ ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃদ্ধি শুল্ক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পায় এছাড়া সরকারের অনেক রকম নগদ লাভ হয় যেমন সরকার যদি কোনো আবাসন তৈরি করে বিক্রি করে দেয় তাহলে তা থেকেও সরকারের কোষাগারে প্রচুর অর্থ আসতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরিচাঁদ ও তাঁর সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম

•    মতুয়া ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল পূর্ব বাংলার এক অতি প্রত্যন্ত গ্রাম ওড়াকান্দি তে যা বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এই গ্রামের পার্শ্ববর্তী সফলাডাঙ্গা গ্রামে জন্ম হয়েছিল মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের। তাঁর প্রচারিত ধর্ম ক্রমশঃ মতুয়া ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।   •    হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম দর্শনকে সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম  (১)  বলে অভিহিত করেছেন, এবং তার প্রচারিত এই ধর্মদর্শনের মাধ্যমে বেদ ও ব্রাহ্মণ বর্জন  (২)  করার কথা বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই তার ধর্ম দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক।   •    তিনি বেদ বর্জন করতে বলেছেন অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম ও তার বিধান পরিহার করে চলার কথা বলেছেন এবং বৈদিকতা মুক্ত জীবন যাপন করার কথা বলেছেন। (৩) •    আমরা জানি যে, বেদের গর্ভেই বর্ণবাদের উৎপত্তি, বর্ণবাদ থেকে জাত পাত প্রথার উৎপত্তি যা ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতাকে দূষিত দুর্গন্ধ ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। এই বর্ণবাদ ও জাতপাত প্রথার কারণেই ভারতের একশ্রেণীর মানুষ বর্ণবাদের পীড়নে নির্যা...

সনাতন ধর্ম ও শিব

  হিন্দু ধর্মটা আসলে কি ? এটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। কেউ বলছে বৈদিক ধর্মই হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে মূর্তি পূজা হিন্দু ধর্ম, কেউ বলছে হিন্দু ধর্ম কোন ধর্মই নয়। আসুন এই প্রশ্নের মীমাংসা করা যাক। প্রথমে আসি বৈদিক ধর্মের প্রসঙ্গে। বেদকে কেন্দ্র করে যে ধর্ম পল্লবিত হয়েছে সেটাকেই অনেকে হিন্দু ধর্ম বলে মনে করেন, বেদকেই হিন্দু ধর্মের ভিত্তি বলে মনে করেন এবং বৈদিক দর্শনকেই হিন্দু ধর্মের দর্শনের ভিত বলে মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, বেদে হিন্দু শব্দের কোন উল্লেখ নেই। বেদের মধ্যে কোথাও মূর্তিপূজা করার কথা বলা নেই। শিব কালি দুর্গা এদের কথা নেই। বেদের মুখ্য দেবতা হলেন ইন্দ্র বরুণ অগ্নি মিত্র এরা। আর বেদের কোথাও এদের মূর্তি করে পূজা করার কথা বলে নেই। বেদে যে ধর্ম উপাসনার কথা বলা হয়েছে তা হলো যাগযজ্ঞ, যজ্ঞের মাধ্যমে উপাসনা। তাহলে হিন্দুরা যে মূর্তি পূজা করে এটা তো বৈদিক ধর্ম সম্মত কোন ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্মে মূর্তিপূজাই প্রধান। হিন্দু ধর্মের সেই মূর্তি পূজায় ইন্দ্রের কোন জায়গা নেই।আবার হিন্দুরা যেসব দেবদেবীর পূজা করে সেই দেবদেবীর কথা বেদে উল্লেখ নেই। বেদে যেসব দেব-দেবীর কথা বলা হয়েছে, ই...

পুরুষসূক্ত-র প্রকৃত ব্যাখ্যা

 "ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীৎ বাহু রাজন্যকৃতঃ।  ঊরু তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রো অজাযত।।" অর্থাৎ, পুরুষের মুখ হতে ব্রাহ্মণ, বাহু হতে ক্ষত্রিয়, উরু হতে বৈশ্য ও পা হতে শূদ্র জন্ম নিয়েছে। যে পুরুষের মুখ হতে বা পা হতে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জন্ম নিয়েছে সেই পুরুষ সম্পর্কে তাদের জন্মদাতা বা পিতা হয়। কিন্ত মা এখানে অনুপস্থিত। অর্থাৎ তাদের মা নেই। মা ছাড়াই তাদের জন্ম হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম যে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের জন্ম হচ্ছে পিতার শরীর থেকে, মাতার শরীর থেকে নয়। অর্থাৎ এখানে জন্মদাতা পিতা রয়েছে, কিন্তু জন্মদাত্রী মাতা নেই। অর্থাৎ এই পুরুষসূক্ত ব্রাহ্মণ ও শূদ্র সৃষ্টির জন্য মায়ের প্রয়োজনীয়তাকে সম্পূর্ণ রকমভাবে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ পুরুষ সূক্ত হলো চরম পুরুষতান্ত্রিক ও নারী বিরোধী একটি তত্ত্ব। অর্থাৎ পুরুষ সুক্তে কেবল পুরুষ আছে নারী নেই, পিতা আছে মাতা নেই। ব্রাহ্মণ আছে, ক্ষত্রিয় আছে, বৈশ্য আছে, শূদ্র আছে - মানুষ নেই। তার কারণ, মানুষের জন্ম তো মাতৃগর্ভ থেকে। যেখানে মা নেই সেখানে মানুষ থাকতে পারে না। মা ছাড়া মানুষের জন্ম হয় কি করে ? অর্থাৎ, আমরা এটা বলতে পারি, মাতৃগর্ভ থেকে...